একটি শিশুর চোখ খুলে প্রথম যে অবয়ব দুটি সে চিনে নেয়, তার একটি হলো মা, অন্যটি বাবা। মাকে আমরা দেখি কোলের কাছে, বাবাকে দেখি দূর থেকে। এই ‘দূরত্ব’ আমাদের মনেও একধরনের অব্যক্ত দূরত্ব তৈরি করে। অথচ সেই ব্যক্তিটিই আমাদের জীবনভর শক্তির ভিত্তি।
পৃথিবীর সব ভাষায় ‘বাবা’ শব্দটি একরকম। ছোট্ট অথচ গভীর। এই একটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকে হাজারো আত্মত্যাগ, নির্ঝঞ্ঝাট ভালোবাসা, এবং এক নীরব দায়িত্ববোধের ইতিহাস।
ফাদার্স ডে। উত্তর আমেরিকায় এদিন সন্তানরা তাদের পিতাকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করে। অনেকেই উপহার দেয়, কেউ কেউ বাবার প্রিয় খাবার রান্না করে, কেউ বা নিয়ে যায় তার পছন্দের রেস্টুরেন্টে। কিন্তু এর বাইরেও থাকে কিছু সময়, যা একান্তই বাবা-সন্তানের হৃদয়ের গল্প।
ফাদার্স ডে’র সূচনা এক মেয়ে ও তার বাবার অসাধারণ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। ওয়াশিংটনের স্পোকেন শহরে জন্মগ্রহণ করে সনোরা স্মার্ট ডড নামে একটি মেয়ে। সাল ১৮৮২। অল্প বয়সেই সনোরা তার মাকে হারায়। তাঁর বাবা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট ছিলেন একজন প্রাক্তন মার্কিন সৈনিক। তিনি ছয় সন্তানকে একাই লালন-পালন করেন—যা ছিল সেই সময়ে এক অভাবনীয় ঘটনা।
সনোরা যখন বড় হচ্ছিলো, তখন চার্চে ‘মাদার্স ডে’ উদযাপন হতে দেখে। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে’ আমার মা নেই, কিন্তু যিনি আমার জন্য, আমাদের ভাইবোনের জন্য নিজের জীবনকে উজাড় করে দিলেন, সেই বাবার জন্য কোনো বিশেষ দিন নেই কেন?’
শুরুতে ‘ফাদার্স ডে’ তেমন গুরুত্ব পায়নি। অনেকেই এটিকে ‘ভোগবাদী সংস্কৃতি’ বলে অবজ্ঞা করতেন। তবে সনোরা দমেনি। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, চার্চ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বারবার আলোচনার মাধ্যমে সে এই দিনটির গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়।
১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন নিজ অফিসে ফাদার্স ডে উদযাপন করেন। কিন্তু কংগ্রেস এটিকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়—তারা মনে করত, এমন একটি দিন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে।
১৯২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ ‘জাতীয় ফাদার্স ডে’ পালনের পক্ষে মত দেন। কিন্তু সেটি তখনও আনুষ্ঠানিক ছুটি হিসেবে ঘোষিত হয়নি। পরবর্তীতে, ১৯৫৭ সালে মেইনের সেনেটর মার্গারেট চেজ স্মিথ একটি সংবেদনশীল বক্তৃতায় বলেন- ‘আমরা যদি মায়েদের সম্মান জানাতে পারি, তবে বাবাদের কেন নয়?’
এই বক্তব্য নতুন করে আলোড়ন তোলে। অবশেষে, ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ফাদার্স ডে-কে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা দেন। তারপর থেকে জুন মাসের তৃতীয় রবিবার সারা বিশ্ব জুড়ে পালিত হচ্ছে ‘ফাদার্স ডে’।
কানাডা, আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যে হাজারো প্রবাসী বাবা আছেন, যারা সন্তানদের কাছ থেকে অনেক দূরে থাকেন। যাঁরা সন্তানদের স্পর্শ, শব্দ, নিঃশ্বাসের দূরত্বে থাকেন। অথচ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান। কারণ তারা জানেন—এই পরিশ্রমই একদিন তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়বে। এক প্রবাসী বাবা বলেছিলেন, ‘আমি নই, আমার স্বপ্নটা বেঁচে থাকুক আমার সন্তানের মধ্যে।’
বাবাদের আনন্দ বিলাসবহুল নয়। তারা সন্তানের হাসিতে, সন্তানের পায়ের শব্দে, সন্তানের মুখে ‘বাবা’ ডাক শুনে খুশি হন। এই ছোটো ছোটো জিনিসগুলোই তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।
ফাদার্স ডে যেন শুধু একটা কার্ড কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে সীমাবদ্ধ না থাকে। এই দিনটি হোক উপলক্ষ—বাবার সঙ্গে সময় কাটানোর, তাঁর কষ্ট বোঝার, ভালোবাসা জানানোর।
আপনি যেখানেই থাকুন, বাবা হয়তো আপনার জন্য অপেক্ষায় আছেন- একটা ফোন কলে, একটা ‘কেমন আছো?’ শুনতে।
যদি আপনার বাবা আজ পৃথিবীতে না থাকেন, তাহলে তাঁর স্মৃতিকে স্মরণ করুন, তাঁর শেখানো মূল্যবোধকে বাঁচিয়ে রাখুন।
ফাদার্স ডে হোক আমাদের হৃদয়ের উৎসব—প্রতিটি সন্তানের মনে জেগে উঠুক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা।
আমার বাবা আজ বেঁচে নেই। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমি তাঁকে স্মরণ করি। সুযোগ পেলে আমি তাঁর সমাধিতে গিয়ে দুই হাত তুলে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি—
হে পরম দয়ালু আল্লাহ,
আমি আজ আপনার দরবারে হাত তুলেছি—এক সন্তানের কণ্ঠে বয়ে চলা চিরন্তন ব্যথা আর গভীর ভালোবাসা নিয়ে। যিনি আমাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, যিনি আমাকে পথ চলতে শিখিয়েছেন, যিনি নিজের সমস্ত স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে আমার ভবিষ্যতের ভিত গড়েছেন—আজ তিনি এই পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতি, তাঁর শিক্ষা, তাঁর আদর্শ আজও আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে বাস করে।
হে জগতের রাজাধিরাজ,
আমার পিতার জীবনের সব গুনাহ আপনি ক্ষমা করে দিন। তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন, যে আদর্শ রেখে গেছেন, যে ভালোবাসা তিনি নিঃশব্দে আমাদের মাঝে বিলিয়ে গেছেন—আপনি তার সবটুকু কবুল করুন। আপনি তাঁর কবরকে প্রশান্তির বাগান করে দিন। জান্নাতুল ফেরদৌসে তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দিন। তিনি যেন আপনার নৈকট্যে শান্তিতে থাকেন, অনন্ত আলোয় বিশ্রাম নেন।
হে পরাক্রমশালী আল্লাহ,
আমি জানি, আমি অনেক সময় বুঝে কিংবা না বুঝে আমার পিতার মনে কষ্ট দিয়েছি। হয়তো তাঁর কোনো উপদেশ অগ্রাহ্য করেছি, হয়তো তাঁর কোনো আবেগকে অবহেলা করেছি, হয়তো কখনো তাঁর ক্লান্ত চোখের ভাষা বুঝিনি। আজ তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই আমার। আমি তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারবো না—’বাবা, আমাকে ক্ষমা করে দাও।’
হে আল্লাহ, আপনি আপনার ফেরেশতাদের মাধ্যমে আমার হৃদয়ের এই অনুতপ্ত আবেদনটি আমার বাবার রুহের কাছে পৌঁছে দিন। জানিয়ে দিন—আমি অনুতপ্ত, আমি কাঁদছি, আমি আমার পিতার কাছে ক্ষমা চাইছি।
হে বিচার দিনের অধিপতি
আমার বাবা জীবদ্দশায় আমার জন্য অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আমি যেন সৎ থাকি, মানুষের উপকারে আসি, সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকি, তাঁর মুখ যেন আমি উজ্জ্বল করতে পারি। আমি যেন আমার বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারি—আপনি আমাকে সেই তওফিক দিন। আপনি আমাকে এমন শক্তি দিন যাতে আমি তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শকে জীবনে ধারণ করতে পারি।
হে আমার প্রতিপালক,
আমার বাবার জীবনের যত কষ্ট, যত নির্ঘুম রাত, যত ব্যর্থতা আর গোপন কান্না—আপনি সেগুলোকে আপনার রহমতের আলোয় ঢেকে দিন। তাঁকে দিন চিরন্তন শান্তি। তাঁর প্রতিটি দুঃখ যেন আপনার দয়ার সাগরে বিলীন হয়ে যায়।
হে সর্বশ্রোতা আমার প্রভু,
আমি শুধু আপনার কাছে প্রার্থনা করি—আপনি আমার বাবাকে মাফ করে দিন, তাঁকে আপনার ভালোবাসায় ভরে দিন, তাঁকে আপনার সবচেয়ে প্রিয় বান্দাদের কাতারে স্থান দিন। আর আমাকে দিন সেই হৃদয়, যেটি পিতার স্বপ্ন বহন করতে পারে; দিন সেই প্রজ্ঞা, যেটি পিতার শিক্ষা রক্ষা করতে পারে; আর দিন সেই বিশ্বাস, যা আমাকে প্রতিটি দিনে বাবার কথা মনে করিয়ে দেয়।
হে পরম স্নেহশীল আল্লাহ, আমার বাবাকে আপনি ভালোবাসুন, যেমন তিনি আমাকে ভালোবেসেছেন।
আমিন।