বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৭:৩১ পূর্বাহ্ন
নোটিশ::
কক্সবাজার পোস্ট ডটকমে আপনাকে স্বাগতম..  

কক্সবাজার সৈকতে ‘প্লাস্টিক দানব’

প্রতিবেদকের নাম:
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২২

সচেতনতা তৈরিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে গেলে দেখা মিলবে এক অদ্ভুত ‘দানব’-এর। সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ রোধে জনসচেতনতা তৈরিতে এই প্লাস্টিক দানব তৈরি করেছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।

বৃহস্পতিবার দানবটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এটা দেখতে ভিড় করছেন পর্যটক ও স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা যায় পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে একটি দানব তৈরি করা হয়েছে। এতে ব্যবহার হয়েছে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, ভাঙা বালতি, চেয়ার, বলসহ নানা ধরনের প্লাস্টিকের বর্জ্য। ১৬ জন স্বেচ্ছাসেবক গত সাত দিন ধরে এ দানব তৈরি করেছেন।

২০ বস্তা পরিত্যক্ত প্লাস্টিকে বানানো হয়েছে ৩৮ ফুট উচ্চতা ও ১৪ ফুট প্রস্থের এক দানব। এটা বানাতে ব্যবহার হয়েছে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, ভাঙা বালতি, চেয়ার, বলসহ নানা ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য। ১৬ জন স্বেচ্ছাসেবক সাত দিন ধরে এ দানব তৈরি করেছেন।

এটি তৈরির মূল পরিকল্পনাকারী হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থী আবির কর্মকার।

জানা গেছে, টেকসই উন্নয়ন ধরে রাখতে বাংলাদেশের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি। আর এই ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্লাস্টিক অপচনশীল অবস্থায় দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে যায়, বাড়ায় দূষণ। তবে অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠায় তা পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। পরিত্যক্ত প্লাস্টিকে মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণী রয়েছে হুমকিতে।

সুগন্ধা পয়েন্টে বেড়াতে আসা পর্যটক রইসুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর ৪ বার কক্সবাজারে ঘুরতে এসেছি। কিন্তু এবার এসে সৈকতে ভিন্ন দৃশ্য দেখতে পেলাম। বিশাল আকৃতির এ দানব অবাক করে দিয়েছে।

তবে এটি আমাদের সচেতনতার জন্য তৈরি করা হয়েছে জেনে ভালো লেগেছে। বেড়াতে এসে আমরা যে সৈকতকে দূষিত করি সে বিষয়েই আমাদের জানান দেয়া হয়েছে।’

ঢাকা থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নাদিরা কানন বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ কর্মসূচি চালু রয়েছে। কক্সবাজারে এটি চালু হওয়াতে খুবই ভালো লাগছে। প্লাস্টিক বর্জ্য যে আসলে সমুদ্রের ওপর দানবীয় অত্যাচার করছে তা প্রমাণ করতে হবে। প্লাস্টিকের দানব থামাতে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত।’

প্লাস্টিকের দানব তৈরির মূল পরিকল্পনাকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থী আবির কর্মকার। তিনি এ বিষয়ে বলেন, ‘প্লাস্টিক দানবটি তৈরি করতে এরই মধ্যে ২০ বস্তা পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে। এসব পরিত্যক্ত পণ্য কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। গত সাত দিন ধরে দিনরাত কাজ করে এ দানব তৈরি করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্লাস্টিকের দানবটির উচ্চতা ৩৮ ফুট ও প্রস্থ ১৪ ফুট। আমি, শুভ্র বাড়ৈ, নির্ঝর, সাব্বির, বিদ্যানন্দের আট জন স্বেচ্ছাসেবক ও চার জন কাঠমিস্ত্রি মিলে প্লাস্টিক দানবটি তৈরি করেছি। মূলত মানুষের কাছে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এটি তৈরি করা হয়।’

কবির উদ্দিন নামে স্থানীয় একজন বলেন, ‘কক্সবাজার সৈকতে প্রতি বছর পর্যটন মৌসুমে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। তখন সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ-প্রতিবেশ হুমকিতে পড়ে। হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে সাগরের নীল জল। প্লাস্টিক বর্জ্যে বিপন্ন হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণী।

মারা পড়ছে গভীর সমুদ্র থেকে ডিম পাড়তে আসা মা কচ্ছপ, দ্বীপের চতুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাল-শৈবাল। এমন অবস্থায় দ্বীপের প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। এটা চলমান থাকা প্রয়োজন। যাতে আগত পর্যটকরা বুঝতে পারে, তারা যেটা করছেন সেটা ঠিক নয়।’

আর এ দানবই পরবর্তীকালে মানবসমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এটি আগামী দুই মাস সমুদ্রসৈকতে থাকবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা।

আয়োজকরা জানান, জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের বিষয়ে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের একদল স্বেচ্ছাসেবী গেল কয়েক দিন ধরে সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রচারণা চালিয়েছেন। প্রথম দিনে বর্জ্য সংগ্রহে ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। মঙ্গলবার কর্মসূচির প্রথম দিন অন্তত ৪০০ পরিবারের লোকজন চার মেট্রিক টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য দোকানে নিয়ে আসেন।

এছাড়া, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্লাস্টিক স্ট্যাচু তৈরির আগেই সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকতে বিদ্যানন্দের পক্ষ থেকে ‘প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ স্টোর’ খোলা হয়েছিল। এই দোকানে মানুষ প্লাস্টিকপণ্যের খালি পাত্র, বোতল বা পলিথিন এক্সচেঞ্জ করে নিতে পারবেন চাল, ডাল, তেল, চিনি ও লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। এতে স্থানীয়দের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদা যেমন পূরণ হবে, ঠিক তেমনই কমবে দ্বীপটির পরিবেশ দূষণ।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ‘পড়বো, খেলবো, শিখবো’ স্লোগানকে সামনে রেখে কিশোর কুমার দাসের নেতৃত্বে ২০১৩ সালে নিজেদের কার্যক্রম শুরু করে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদানের কার্যক্রমের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে ‘এক টাকার আহার’-এর মতো আরও নানামুখী উদ্ভাবনী প্রকল্প পরিচালনার মধ্য দিয়ে বিদ্যানন্দ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি সারাদেশে পরিচিতি পেয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আবু সুফিয়ান বলেন, ‘এই দানব তৈরির মাধ্যমেই বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ও জেলা প্রশাসন সমাজকে একটি বার্তা দিতে চায়, প্লাস্টিকের বর্জ্য ফেলে যেভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তা ধীরে ধীরে দানবে রূপ নিচ্ছে।


আরো খবর: