মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ০৬:৫৯ অপরাহ্ন
নোটিশ::
কক্সবাজার পোস্ট ডটকমে আপনাকে স্বাগতম..  

উখিয়ায় ছাত্রলীগ নেতার বাড়িতে সরকারি চাল : উদ্ধার ১১১ বস্তা : অবশেষে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
আপডেট: বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৩

কক্সবাজারের উখিয়ায় দুস্থ মহিলা সহায়তা (ভিডাব্লিউবি) প্রকল্পের ১১১ বস্তা চাল জব্দ করেছে র‌্যাব-১৫। এর ওজন ৩ হাজার ৩৩০ কেজি।
সোমবার (১৬ অক্টোবর) দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের রুমখাঁ চৌধুরীপাড়া এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

র‍্যাব-১৫ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ল এন্ড মিডিয়া) মো. আবু সালাম চৌধুরী এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, অবৈধ ভাবে সরকারি চাল বিক্রির গোপন খবর পেয়ে সোমবার মধ্যরাতে উখিয়ার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের রুমঁখা চৌধুরী পাড়ায় র‌্যাবের একটি চৌকস অভিযানিক দল উখিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সালেহ আহমদের সহযোগিতায় চৌধুরী পাড়া এলাকায় মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করে অভিযানে খাদ্য অধিদপ্তরের ১শ ১১ বস্তা আতপ চাউল উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত চাউল গুলো জব্দ তালিকা তৈরিপূর্বক পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে এসি ল্যান্ডের মাধ্যমে উখিয়া খাদ্য গুদামে জমা করা হয়েছে।

উখিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সালেহ আহমেদ জানান, চাউল উদ্ধারের অভিযানটি সম্পুর্ণ পরিচালনা করেছেন র‌্যাব-১৫। অভিযান শেষে উপজেলা প্রশাসনকে খবর দিলে, ইউএনও এর নির্দেশ আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চাউলগুলোর জব্দ তালিকা করে সরকারী খাদ্য গুদামে জমা দিয়ে দিয়। এখন কার বাড়ী থেকে বা কার গুদাম থেকে চাউল গুলো উদ্ধার করা হয়েছে, কারা সরকারি চাউল গুলো পাচার, বিক্রি এবং ক্রয়ের সাথে জড়িত সেটা র‌্যাব কর্তৃপক্ষ অবগত এবং তারাই সেটা ভালো বলতে পারবে। তাই লিখিত অভিযোগ প্রদান বা মামলা র‌্যাব-১৫ কেই করতে হবে।

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, আমি এখনো অফিসিয়াল ভাবে লিখিত কোন অভিযোগ পায়নি, লিখিত অভিযোগ পেলে নিয়ম অনুযায়ী তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

র‌্যাব-১৫ এর কমান্ডিং অফিসার ( অধিনায়ক) লেঃ কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন জানান, হলদিয়ার চৌধুরী পাড়া থেকে সরকারী চাউল উদ্ধার বিষয়ে মামলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান হোসাইন সজীব জানান, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ৪০ হাজার দুস্থ পরিবারের জন্য এ চাল বরাদ্দ দেয়। প্রতিটি ইউনিয়নে মাসে পরিবার প্রতি ৩০ কেজি করে এই চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।

উখিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম জানান, উখিয়া উপজেলায় কি এখন চাউল কুঁড়ে পাওয়া যায়? সরকারি চাউল গুলো তো র‌্যাব-১৫ কারো বাড়ী থেকে বা কোন গুদাম থেকে বা কোন গাড়ী থেকে তো উদ্ধার করেছে। এই চাউল তো সরকারি খাদ্য গুদাম বা ইউনিয়ন পরিষদের গুদামে থাকার কথা, কিন্তু চাউল গুলো ইউপি চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস চৌধুরীর মহল্লায় বা গ্রামে আসলো কিভাবে?
তিনি আরো বলেন, যার বাড়ী, গুদাম ও গাড়ী থেকে চাউল গুলো উদ্ধার করা হয়েছে এবং যারা সরকারী চাউল বিক্রি করেছেন, যারা সরকারী চাউল গুলো ক্রয় করেছেন, যারা সরকারী চাউল গুলো পাচারে সহযোগিতা করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন তাদের সকলেই বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য র‌্যাব-১৫ এর প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। এতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও র‌্যাব এর ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পাবে।

উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও রত্না পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল হুদা জানান, র‌্যার-১৫ এর এ অভিযানটি সত্যি প্রশংসিত ছিলো। ভবিষ্যতে উখিয়ার মাদকসহ সকল প্রকার অপরাধ দমনে র‌্যাব আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুক সেটা সকলের কাম্য।

হলদিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান আমিনুল হক আমিন জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে সরকারি চাউল পাচারের ঘটনা সত্যি দুঃখজনক। ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি।

হলদিয়া পালং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. শাহ আলম অভিযোগ করেন, হলদিয়া পালং ইউনিয়নের পাঁচ হাজার দুস্থ নারীর জন্য বরাদ্দ করা চাল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হরিলুট চলে আসছে। এর সাথে সরাসরি জড়িত স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা। বিষয় অবগত হয়ে ও অভিযোগ আমলে নিয়ে এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশ্লিষ্টদের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।

সরকারি চাল বরাদ্দের স্থানীয় চেয়ারম্যানের দুর্নীতি ঘটনা তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ পরিচালক মো: মনিরুল ইসলাম।

হলদিয়া পালং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সাজু জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, দেশের মানুষের ভোটের ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে, অন্যদিকে অসহায় দুস্ত ও গরীব মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে পদত্ত সরকারী চাউল যারা আত্মসাৎ ও পাচার করার অপচেষ্ঠার তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক, “সুজনের” উখিয়ার সভাপতি সাংবাদিক নূর মোহাম্মদ সিকদার এ প্রসঙ্গে বলেন, গরিবের হক আত্মসাৎ করে লুটপাটকারী দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সমীচীন হবে, নচেৎ এক্ষেত্রে দুর্নীতি আরো বেড়ে যাবে। শুভঙ্করের ফাঁকির মাধ্যমে গরিবের রিজিক চুরির হিড়িক পড়বে এবং সরকারের অভূতপূর্ব অর্জন
বিসর্জনের সম্মুখীন হবে।
তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মহতী উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করতে উখিয়ার একশ্রেণীর লোভী দুর্নীতিপরায়ণ জনপ্রতিনিধিরা নয়,ছয়ের মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ম্লান করে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

মোজাহের কোম্পানির পরিবার সুত্রে জানা গেছে, জনৈক আরিফের কাছ থেকে সিরাজ চাউল গুলো ক্রয় করেছে। পরে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে তার বাড়ী থেকে চাউল গুলো জব্দ করে নিয়ে যায়।

হলদিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানান, আমরা সরকারি নিয়ম ও নির্দেশনা অনুযায়ী চাউল গুলো বিতরণ করেছি তালিকাভূক্ত উপকার ভোগীদের মাঝে। এখন কারা চাউল গুলো বিক্রি করেছে, কারা ক্রয় করেছে, কারা মজুত করেছে সেটা চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের জানার কথা নয়।

চাউল বিক্রেতা আরিফের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মোবাইল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয় নি।

স্থানীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, হলদিয়াপালং ইউনিয়নের তালিকাভুক্ত ভিজিডির কার্ডধারীদের মাঝে বরাদ্দকৃত বিগত কয়েক মাসের চাল বিতরণ না করে, উপকারভোগীদের নিকট থেকে জোর পূর্বক টিপসই আদায়পূর্বক আদায় করা হচ্ছে হলদিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদে। ঐসব চাউল পরে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস চৌধুরীর বিশ্বস্ত সহচর জনৈক আরিফের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে দেন।
তার ধারাবাহিকতায় আরিফের কাছ থেকে রুমঁখা চৌধুরী পাড়া গ্রামের মোজাহের কোম্পানির পুত্র উখিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক মোঃ আলমগীর ও সিরাজুল ইসলাম চাউলগুলো ক্রয় করে পাচারের উদ্দেশ্যে তার বাড়ীতে মজুত করেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি জানিয়েছেন।

মোজাহের কোম্পানির বাড়ি ও গুদাম থেকে চালগুলো র‌্যাব ১৫ জব্দ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করা হলেও বিষয়টি বর্তমানে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য চাউল গুলো পরিত্যাক্ত উদ্ধার দেখানোর পায়তারা করছে। পাশাপাশি প্রশাসনের পারস্পারিক বিরোধী বক্তব্য নিয়ে সর্বমহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছি।

সচেতন মহলের মতে, প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে চাউল গুলোর প্রকৃত মালিক কে? চাউল বহনকারী পরিবহনটি কার? কোথায় থেকে, কারা চাল গুলো এনে মজুত করছে? তার বিস্তারিত আদ্যোপান্তর তথ্যের তলের বেড়াল বেরিয়ে পড়বে।

এদিকে ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা না হওয়ায় উখিয়া সচেতন মহল সহ সর্বত্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সকলের প্রশ্ন যেভাবে গর্জন হলো, সেভাবে বর্ষণ হলো না।

উল্লেখ্য, হতদরিদ্র পরিবারগুলোর খাদ্যের যোগান দিতে প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিশেষ কর্মসূচি তথা শেখ হাসিনার নির্দেশ খুদা হবে নিরুদ্দেশ এই স্লোগানের আলোকে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।

সর্বশেষ পাওয়ার খবরে জানা গেছে, র‌্যাবের এস আই মংকু চাকমা বাদী হয়ে ১ জন কে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। যার উখিয়া থানা মামলা নং ৪৩ তারিখ ১৭ অক্টোবর ২০২৩ ইং। জিআর মামলা নং ৫৮০ /২০২৩। এজাহারে উল্লেখিত আসামি হলেন উখিয়া হলদিয়া পালং ইউনিয়ন রুমখা চৌধুরী পাড়া গ্রামের মোজাহের কোম্পানির পুত্র সিরাজুল ইসলাম। অজ্ঞাত নামা আসামি রাখা হয়েছে আরো ৪/৫ জন আসামী। আলোচিত এই মামলার তদন্তকারী অফিসার হলেন উখিয়া থানার এস আই মনোজ কান্তি কুরী।


আরো খবর: