তারিখ: মঙ্গলবার, ২রা জুন, ২০২০ ইং, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Share:

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট কানেকশনে বিধিনিষেধ আরোপের সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি বলছে এর ফলে ত্রাণ ও জরুরি সেবা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা বদরুল আলম রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকেন এবং নানা ইস্যুতে ক্যাম্পে নেতৃস্থানীয় ভূমিকাও পালন করেন।

আজ শনিবার ঢাকা থেকে ফোনে কয়েকদফা চেষ্টার পর তাকে পাওয়া গেলেও বারবার ফোন সংযোগ কেটে যাচ্ছিলো।

মিস্টার আলম জানান রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক আগের তুলনায় অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, “কারোও সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না আমরা। প্রশাসনের সাথেও যেমন পারছি না তেমনি এনজিওর সাথেও পারছি না। সবারই সমস্যা হচ্ছে। নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে কথা বলতে পারছিনা”।

মূলত শরণার্থী ক্যাম্প এলাকায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির খবরাখবর গণমাধ্যমে আসার পটভূমিতে চলতি মাসের শুরুতে ক্যাম্পগুলোতে নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলো ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। সে অনুযায়ী বিটিআরসি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয় অপারেটরদের।

কিন্তু টেকনাফ ও উখিয়ায় স্থানীয়দের কথা বিবেচনা করে পরে শুধু ক্যাম্প এলাকায় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থ্রিজি ও ফোর জি সেবা বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়।

এখন আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট যোগাযোগে বিধিনিষেধের কারণে জটিল ত্রাণ ও জরুরি সেবা বাধাগ্রস্ত হবে।

আজ এক বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব, তবে সেজন্য ইন্টারনেট সুবিধা বন্ধ করা দেয়া কোনো উপায় হতে পারে না।

সংস্থার দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “বাংলাদেশে এতো বেশি শরণার্থী, এদের সাথে যোগাযোগ করা, এদের খবর জানানো, তথ্য দেয়া-এসবের জন্য তারা কিন্তু ফোনের উপর নির্ভরশীল। যতদিন তারা এখানে আছে ততদিন তাদের সুবিধা সম্পর্কে জানানো বা মিটিং হবে, এসব জানানোর জন্যই তো তাদের যোগাযোগের সুবিধা থাকা দরকার”।

কিন্তু ফোন সুবিধায় বিধিনিষেধ আরোপের কারণ হিসাবে সরকার যে আইন শৃঙ্খলার কথা বলছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, “যারা অপরাধ করে তাদের ধরুক। পুরো এক মিলিয়ন লোককে তো শাস্তি দেয়া ঠিক না, তাই না?”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ প্রশংসা পেয়েছিলো কিন্তু তথ্য-প্রবাহ ও অন্য অধিকার বন্ধ করলে সেটি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সমালোচনার ঝুঁকি তৈরি করবে।

তবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করে যেসব এনজিও তারা ক্যাম্পে থ্রি জি বা ফোর জি সেবা বন্ধের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার বাংলাদেশ প্রধান গিওরগি গিগাউরি বলছেন ভালো টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা মানবিক সহায়তায় যারা নিয়োজিত তাদের নিজেদের মধ্যে এমনকি সরকারের সাথে যোগাযোগেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

“আমাদের পরামর্শ হবে যত বেশি সম্ভব টেলিযোগাযোগ সুবিধা শরণার্থীদের দেয়া এবং অবশ্যই মানবিক সহায়তায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগের অনুমতি দেয়া।”

তিনি বলে জরুরি ভিত্তিতে মানবিক সহায়তার দিকটাও মাথায় রাখা দরকার।

”ভুলে গেলে চলবে না এখানে ভূমিধ্সসহ অনেক সমস্যা হচ্ছে, যে কারণে জরুরি ভিত্তিতে মানবিক সহায়তার জন্যও যোগাযোগের দরকার আছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা তারা যে পাচ্ছে এটা নিশ্চিত করার জন্যই রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে কিংবা যারা মানবিক সহায়তার কাজ করে তাদের মধ্যে যোগাযোগের প্রয়োজন আছে”।

তবে কক্সবাজারে ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: মাহবু্ব আলম তালুকদার বলছেন ত্রাণ ও জরুরি সেবা বাধাগ্রস্ত হতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ সরকার নেয়নি।

“সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিটিআরসি কাজ করবে। আমাদের মানবিক কার্যক্রমে সেজন্য ব্যাঘাত হবে না। বেসরকারি সংস্থাও সরকারের অনুমতি নিয়ে কাজ করে। ত্রাণ কার্যক্রমে বিঘ্ন হবার সুযোগ নেই। ত্রাণ কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলবে এবং চলছে।”

মিস্টার তালুকদার বলছেন টেলিযোগাযোগ বা ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে বিধিনিষেধ দেয়া হলে সেজন্য ত্রাণ কার্যক্রম বা জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেই মনে করেন তারা।

ছবির কপিরাইটDIBYANGSHU SARKAR
Image caption
রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে এভাবে ঢলের মতো
বিবৃতিতে আর কী বলেছে এইচআর ডব্লিউ
সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, “শরণার্থী ক্যাম্পে যোগাযোগে বিধিনিষেধ জরুরি সেবাকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি বসবাসের করুণ অবস্থাকে আরও খারাপ করবে এবং জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবে”।

সংস্থাটি বলছে মানবিক সহায়তা কর্মীরা জানিয়েছে যে কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের কারণে জরুরি সেবাসহ তাদের সহায়তা দেয়ার সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একজন সহায়তা কর্মীকে উদ্ধৃত করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে তারা বর্ষা মৌসুমে অবকাঠামো সংস্কারে জরুরি সেবা দিতে শরণার্থীদের কাছ থেকে ফটো কিংবা অন্য তথ্য পাচ্ছেন না।

“এখন আমরা না পৌঁছানো পর্যন্ত বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্তদের অপেক্ষা করতে হবে”।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে শরণার্থীদের ক্যাম্পের বাইরে বিশেষ করে মিয়ানমারে তাদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ সুবিধা অন্তত গুরুত্বপূর্ণ।

“এটা শুধু ভালো থাকার জন্যই নয়, বরং রাখাইনের পরিস্থিতি জানার জন্যও এটা সরাসরি তথ্যের উৎস। এই তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্যও। বিশেষ করে যখন মিয়ানমার প্রমাণ দিচ্ছে যে তাদের দেয়া তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়”।

Share: