তারিখ: বুধবার, ২৩শে জানুয়ারি, ২০১৯ ইং, ১০ই মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Share:

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, লামা :;
“যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম, মহেশখালীর পানের খিলি তারে বানাই খাবাইতাম” পান নিয়ে এ রকম অসংখ্য জনপ্রিয় গান রচিত হয়েছে। পান বাংলা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ধরা যায়। পান খাওয়ার উল্লেখযোগ্য কিছু উপকারিতা রয়েছে। ভারতবর্ষে প্রাচীন ভেষজ গ্রন্থ আয়ুর্বেদে নিঃশ্বাস দুর্গন্ধমুক্ত রাখার জন্য পান সেবনের উল্লেখ আছে। নিয়মিত পান খেলে নিঃশ্বাসে কোনো দুর্গন্ধ থাকে না, হজমও ভালো হয়। কিন্তু তার জন্য পানের সকল উপকরণ (বিশেষ করে চুন) হতে হবে ভেজালমুক্ত।
পান খেতে চুন লাগে, এ কথাটি জানে না এমন মানুষ খুজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই চুন কি ভাবে তৈরী হয় তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই। চুন তৈরীতে শামুক ও ঝিনুকের খোলশ ব্যবহার করা হয়। চুন তৈরীর জন্য প্রথমে এই শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহ করে তা ভাটায় (শামুক ও ঝিনুক পোড়ানোর বিশেষ চুলা) কাঠের টুকরা ও শামুক এবং ঝিনুক পর্যায়ক্রমে সাজিয়ে আগুনে পোড়ানো হয়। এভাবে ২ থেকে ৩ঘন্টা পোড়ানোর পর শামুক ও ঝিনুক পুড়ে সাদা রং ধারন করে। পোড়া শামুক ও ঝিনুকগুলো নামিয়ে চালুনির মাধ্যমে নষ্ট শামুক ও ঝিনুক গুলো আলাদা করতে হয়। এরপর পোড়ানো ভাল শামুক ও ঝিনুকগুলো চুর্ণ বিচুর্ণ করে মাটির চাড়িতে পানির সাথে মিশিয়ে নিতে হয়।
মাটির চাড়িতে কাঠি দিয়ে ২০/২৫ মিনিট ঘুটলে চুনের সাদা রং বেড়িয়ে আসে এবং তৈরি হয় পান খাওয়ার গুরুত্বপূর্ন উপাদান চুন। এভাবে ৫০ কেজি শামুক ও ঝিনুক পুড়ানো চুর্ণ-বিচুর্ণ পানির সাথে মিশেয়ে প্রায় ১৫০/১৮০ কেজি চুন তৈরি করা যায়। অনেকে ধবধবে সাদা করতে চুনের সাথে বিচি কলার রস মিশায়। এরপর তা জালের মাধ্যমে ছেঁকে বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রয়ের উপযোগী করা হয়। আঞ্চলিক ভাষায় এই চুন শিল্পের সাথে জড়িত কারিগরদের চুনুটে বা চুনে বলা হয়। পানের ব্যাপক চাহিদার কারণে পানের প্রধান উপকরণ চুনেরও প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে লামায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সামুদ্রিক নানা প্রজাতির ঝিনুক পুড়িয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ক্ষতিকর চুন তৈরি করছে। সম্প্রতি সময়ে লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে এমন কয়েকটি চুন তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। যাদের চুন তৈরির কোন প্রকার লাইন্সেস এবং কাগজপত্র নেই। এছাড়া পার্শ্ববর্তী চকরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা এলাকায় আরো কয়েকটি চুন তৈরির কারখানা করা হয়েছে।
উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড নয়াপাড়া এলাকায় সামুদ্রিক ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরি করেন মুকবুল হোসেন (৫১) নামে এক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, আমরা সামুদ্রিক নানা প্রজাতি ঝিনুক এনে পুড়িয়ে চুন তৈরি করি। এছাড়া চকরিয়া উপজেলার ডুলহাজার এলাকা হতে ঝিনুকের চূর্ণ সংগ্রহ করেও চুন তৈরি করে থাকি। সকল প্রকার শামুক ও ঝিনুকের চুন স্বাস্থ্যসম্মত কিনা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চুন তৈরি ঠিক কিনা ? এমন প্রশ্ন করলে তিনি কোন উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান। কারখানা পরিচালনায় কোন প্রকার অনুমোদন নেই বলেও তিনি জানায়।
নাম প্রকাশ না করা সত্ত্বে আশপাশের কয়েকজন বলেন, যখন তারা ঝিনুক পুড়ায় তখন কালো ধোঁয়া ও দুগন্ধে এলাকায় থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সমুদ্রের পাড়ে মরে পড়ে থাকা সব ধরনের ঝিনুক দিয়ে তারা চুন তৈরি করে। স্বাধে ও গন্ধে এই চুন ভাল নয়। ফাইতং ইউপি চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন বলেন, চুনের কারখানার বিষয়ে আমি কিছু জানিনা।
লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ মোহামুদুল হক বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সরকারি অনুমোদন ও লাইসেন্স ছাড়া চুনের কারখানা পরিচালনা করা যায়না। চুন হল ক্ষারকীয় ও ক্যালসিয়াম যুক্ত একটি অজৈব উপাদান। যার মধ্যে ক্যালসিয়াম অক্সাইড বা ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড রয়েছে। উপজেলা স্যানেটারী ইন্সেপেক্টর মাধুবী লতা আসাম বলেন, চুন কারখানা পরিচালনা করতে ফিটনেস, ট্রেড, ডেলিং ও প্রিমিসেস লাইসেন্স প্রয়োজন। এইসব কাগজপত্র ছাড়া কারখানা পরিচালনা অবৈধ। উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ জান্নাত রুমি বলেন, বিষয়টি জেনে ব্যবস্থা নিচ্ছি।

Share:

আপনার মতামত প্রদান করুন ::