বুধবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২১, ০৭:২২ অপরাহ্ন
ঘোষণা:
কক্সবাজার পোস্টে আপনাকে স্বাগতম, আমাদের সাথে থাকুন,কক্সবাজারকে জানুন......

মর্গে থেকে ২৫ দিন পরে মেয়ের মৃতদেহ পেলেন বাবা-মা

প্রতিবেদকের নাম::

প্রকাশ: জানুয়ারি ৪, ২০২১ ১১:১০ পূর্বাহ্ণ | সম্পাদনা: জানুয়ারি ৪, ২০২১ ১১:১০ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে ২৫ দিন পড়ে থাকার পর লাকিংমে চাকমার মরদেহ আদালতের নিদের্শে সোমবার (৪ জানুয়ারি) বাবা- মাসহ স্বজনদের কাছে কাছে হস্তান্তর করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়ন -র‌্যাব।

সোমবার বিকাল সোয়া তিনটায় মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়ানের উপ-পরিদর্শক (এসআই) অর্জুন চৌধুরীর উপস্থিতিতে লাকিংমের চাচাতো ভাই ক্যচিং মং চাকমা স্বাক্ষর করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গের হিমঘর থেকে লাকিংমে চাকমার মরদেহ বাবা-মাসহ নিকট স্বজনদের উপস্থিতিতে গ্রহণ করেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ( আরএমও) শাহীন মোঃ আবদুর রহমান চৌধুরী।

হাসপাতাল চত্বরে উপস্থিত সাংবাদিকদের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের উপ- পরিদর্শক অর্জুন চৌধুরী বলেন, তদন্তে লাকিংমে চাকমার বয়স নাবালিকা অর্থাৎ প্রচলিত আইনে বিয়ের উপযুক্ত হয়নি তার সত্যতা পাওয়া গেছে। তাই তার যদি বিয়ে ও হয়ে থাকে তা আইনগতভাবে অবৈধ। তাই সার্বিক বিবেচনায় তার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য তার মরদেহ বাবা-মার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এটি একটি অপহরণ মামলা হিসেবে আদালতে বিচার কার্য চলবে বলেন মামলার এ তদন্ত কর্মকর্তা।

মরদেহ হস্তান্তরে কিছুটা জটিলতা তৈরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমঘরের ভাড়া বাবদ ২৪ হাজার টাকা দাবী করায়। লাকিংমের পরিবার অসহায় ও দরিদ্র হওয়ায় ওই টাকা পরিশোধ করতে পারেনি। পরে র‌্যাব-১৫ কক্সবাজারের উপ-অধিনায়ক মেজর মেহেদী হাসান বিষয়টি অবগত হয়ে র‌্যাবের পক্ষ থেকে হিমঘরের ভাড়া পরিশোধ করার ব্যবস্থা করেন। এরপর মরদেহ হস্তান্তর করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শাহীন মোঃ আবদুর রহমান চৌধুরী বলেন, গত ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় লাকিংমে চাকমাকে কয়েকজন যুবক হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে আসে। যুবকেরা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের জানায় রোগী বিষপান করেছে। তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানায় হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি হাসপাতালে কর্মরত পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ লাকিংমের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। ১০ ডিসেম্বর লাকিংমের মরদেহের ময়না তদন্ত সম্পন্ন করা হয়। এর মধ্যে আতাউল্লাহ নামে এক যুবক নিজের স্ত্রী দাবী করে মরদেহ তাকে হস্তান্তরের জন্য পুলিশকে আবেদন করে। মেয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর পেয়ে বাবা লালা অং ও হাসপাতালে ছুটে এসে সন্তানের মরদেহ পাওয়ার আবেদন করেন। শুরু হয় আইনী জটিলতা। ১৫ ডিসেম্বর লালা অং চাকমা তার সন্তানের মরদেহ তাকে হস্তান্তরের জন্য টেকনাফ বিচারিক হাকিম আদালতে আবেদন জানান। আদালত শুনানী পূর্বক আবেদনটি গ্রহণ করে লাকিংমের ধর্ম পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য র‌্যাবকে দায়িত্ব অর্পন করেন।

আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মংথেলা রাখাইন বলেন, গত ২৮ ডিসেম্বর মানবাধিকার কর্মীদের একটি দল টেকনাফে লাকিংমে চাকমার বাড়িতে যান। তারা পরিবার, গ্রামবাসি, স্হানীয় জনপ্রতিনিধি ও আতাউল্লাহর পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। পরেরদিন দলটি লাকিংমের বাবার উপস্হিতিতে কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ এর কর্মকর্তাদের সাথে ও কথা বলেন।

কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার সাগর উপকূলবর্তী ইউনিয়ন বাহারছড়ার শীলখালীর অরণ্যভরা আদিবাসী গ্রাম চাকমা পাড়ার অসহায় দরিদ্র লালা অং চাকমা বলেন, গত বছরের পাঁচই জানুয়ারি তার মেয়ে সন্তান লাকিংমেকে একই ইউনিয়নের মাথাভাঙ্গা এলাকার আতাউল্লাহসহ চার-পাঁচ যুবক অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। তিনি ঘটনার দিনই অপহরণের বিষয়টি স্হানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ হাফেজকে অবহিত করে তার মেয়েকে উদ্ধার করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু ওই ইউপি সদস্য কোনরকম ব্যবস্থা নেয়নি। এরপর তিনি বিভিন্ন জায়গায় তার মেয়েকে খুজঁতে থাকেন। আতাউল্লাহর স্বজনদের সাথে ও দেনদরবার করেন। তাতে ফিরে পাননি মেয়েকে। তিনি টেকনাফ থানায় গিয়ে অপহরণের মামলা দায়েরের চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই সময়ে টেকনাফ থানায় কর্মরত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ মামলা না দিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেন। ২৭শে জানুয়ারি তিনি নিজে বাদী হয়ে কক্সবাজার জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে আদেশ দেন।

লালা অং চাকমা তার মামলার আরজিতে উল্লেখ করেছেন তার মেয়ে এখনও বয়সে শিশু। ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক ইস্যু করা জন্ম সনদ অনুযায়ী তার মেয়ের বয়স মাত্র ১৪ বছর ১০ মাস।ইউনিয়ন পরিষদের জন্ম নিবন্ধন শাখার ইস্যুকৃত সনদ মতে, লাকিংমের জন্ম ২০০৫ সালের ২রা মার্চ। তিনি বয়স প্রমাণের কাগজপত্র ও আদালতে জমা দেন। তার মেয়ে নাবালক এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার মেয়ের বিয়ের বয়স হয়নি। সে স্বইচ্ছায় যায়নি, তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আতা উল্লাহরা জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে গেছে।

আদালতের আদেশে গত ৯ আগষ্ট পিবিআই ( পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) এর পরিদর্শক ক্যশেনু মারমা তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেন। প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা ক্যশেনু উল্লেখ করেন, ‘আমি এই মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং স্বাক্ষীদের সাথে কথা বলেছি। প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দী ও নেওয়া হয়েছে। পাঁচজন স্বাক্ষীই ভিকটিম লাকিংমের আত্বীয়। ওই পাঁচজন ছাড়া কেই লাকিংমেকে অপহরণ করা হয়েছে এমন বলেননি। তাই লাকিংমে নিজে স্বইচ্ছায় চলে গেছে মর্মে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

মামলার বাদী লালা অং তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনের উপর না রাজী দিয়েছেন। এ বিষয়ে আদালত পরবর্তী শুনানীর তারিখ ২৮ শে জানুয়ারি নির্ধারণ করেছেন বলে জানিয়েছেন বাদীর আইনজীবী মোহাম্মদ মহি উদ্দীন খান।

লাকিংমে যেদিন মারা যান তার মাত্র ১৩দিন আগে এক পুত্র সন্তান জন্ম দেন। নবজাতক সন্তান বর্তমানে আতাউল্লাহর মায়ের কাছে রয়েছে।

গত ২৮ শে ডিসেম্বর লাকিংমে চাকমার গ্রাম পরিদর্শনে যাওয়া মানবাধিকার কর্মী দলের অন্যতম সদস্য কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ফারাহ তানজিম টিটিল বলেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও আতাউল্লাহর পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে এবং লাকিংমের বয়স সংত্রুান্ত বিভিন্ন কাগজপত্র স্বচক্ষে যাছাই -বাছাই করে দুইটি বিষয় পুরোপুরি স্পষ্ট হয়েছে। তাহলো লাকিংমে স্বইচ্ছায় কারো সাথে যায়নি সে পরিকল্পিত অপহরণের শিকার। দ্বিতীয়ত দেশের প্রচলিত আইন মতে সে নাবালক এবং তার বিয়ের বয়স হয়নি।

এদিকে আজ সোমবার সকাল ১১ টায় কক্সবাজার জেলা শহরের পৌরসভা কার্যালয়ের সামনের সড়কে লাকিংমে চাকমার অপহরণ, বেআইনী বাল্য বিয়ে, ধর্ষণ ও ধর্মান্তরিত করার প্রতিবাদে এবং তার হত্যাকারীদের বিচারের দাবীতে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, হিউম্যান রাইটস্ ডিফেন্ডারস ফোরাম, নারী প্রগতি সংঘ, রাখাইন ওমেন ফোরাম, আদিবাসী ছাত্র পরিষদ, তঞগ্যা স্টুডেন্ট কাউন্সিল এই কর্মসূচির আয়োজন করে।

কক্সবাজার পোস্ট.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
কক্সবাজার পোস্ট সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ
এই জাতীয় আরো খবর::