তারিখ: বুধবার, ২২শে মে, ২০১৯ ইং, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Share:

সাদ্দিফ অভি, বাংলা ট্রিবিউন 

বাংলাদেশ থেকে প্রায় ছয় মাস আগে ইউরোপ যাত্রা শুরু করেন সিলেটের বিলাল। আরও তিনজনের সঙ্গে নানা দেশ ঘুরে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে যাওয়ার পর আরও ৮০ বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা হয় তার। তিন মাস সেখানে একটি কক্ষে আটক থাকার পর একটি নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় ডুবে যায় তাদের নৌকা। মারা যায় অন্তত ৩৭ বাংলাদেশিসহ ৭০ জন। বহু মানুষকে ডুবতে দেখা বিলাল উদ্ধার পান তিউনিস নৌবাহিনীর সহায়তায়।

শুধু বিলাল নন, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাত্রার স্বপ্ন দেখেন বিশ্বের বহু দেশের মানুষ। তবে বিপজ্জনক এই যাত্রায় নৌকাডুবিসহ নানা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তাদের অনেকেই। এসব দুর্ঘটনায় নিহতদের সঠিক পরিসংখ্যান কখনওই পাওয়া যায় না। কারণ সাগরে দুর্ঘটনার কবলে পড়া নৌকার কোনও আরোহীকে জীবিত উদ্ধার করা না গেলে ওই দুর্ঘটনার খবরই থেকে যায় অপ্রকাশিত।

তারপরও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে গত সাত বছরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ প্রবেশ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ হাজার ৯০৬ জন। আর নিখোঁজ রয়েছেন ১২ হাজারের বেশি মানুষ। ইউএনএইচসিআর এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৩ সালে ৬৩৬ জন, ২০১৪ সালে ৭৭০ জন, ২০১৫ সালে ১৫৫৫ জন, ২০১৬ সালে ১৪৮৫ জন, ২০১৭ সালে ৭৯৫ জন, ২০১৮ সালে ৬৭৭ জনসহ এখন পর্যন্ত নিখোঁজ আছে ১২৫৩৯ জন। ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান বিষয়ক দফতর ইউরোস্ট্যাট-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ১৭ হাজার ২১৫ জন রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করলে ১১ হাজার ৭১৫টি বাতিল করা হয়। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে ইতালিতে প্রবেশের হার দিন দিন বাড়ছে। ইউএনএইচসিআর-এর মতে, ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশকারীর সংখ্যায় বাংলাদেশিদের অবস্থান চতুর্থ।.

গত বৃহস্পতিবার নৌকাডুবির পর তিউনিসয়ায় উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের একাংশগত বৃহস্পতিবার নৌকাডুবির পর তিউনিসয়ায় উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের একাংশ

অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে সাতটি রুট ব্যবহার করা হয়। এর সবগুলোই লিবিয়া কিংবা তুরস্ক থেকে ইউরোপ প্রবেশের জন্য ব্যবহার করা হয়। এ সাত রুটের মধ্যে ‘জনপ্রিয়’ কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরের রুট। এটি ব্যবহার করে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়া নিরাপদ মনে করে অনিয়মিত অভিবাসীরা। তাই দালালের কথায় প্রভাবিত হয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে চলে যান লিবিয়া কিংবা তুরস্ক। সেখান থেকে শুরু হয় ইউরোপ যাওয়ার মূল পর্ব। ইউরোপ যেতে মোট খরচ হিসেবে চাওয়া হয় ১০-১৪ লাখ টাকা। সেই টাকা আদায় করা হয় আগেই, এমনকি যাত্রা শুরুর পর শারীরিক নির্যাতন করেও টাকা আদায় করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জুনের শেষ থেকে আগস্ট— এই তিন মাস সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার প্রবণতা বেশি। কারণ এসময় সাগর কিছুটা শান্ত থাকে এবং ছোট ছোট নৌযান নিয়েই ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করে সবাই। লিবিয়ার উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ কিমি দূরে ইতালির ল্যাম্পুসা দ্বীপ। সেখান দিয়েই মূলত ইতালি প্রবেশ করে অনিয়মিত অভিবাসীরা। এছাড়া গ্রীস, স্পেন হয়েও ইউরোপ প্রবেশের চেষ্টা করা হয়। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি থেকে অভিবাসীদের ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার হার কিছুটা হলেও কমেছে। কারণ, লিবিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে অভিবাসী অনুপ্রবেশের উপর নজরদারী চালানোর দায়িত্ব দিয়েছে ইতালি। ফলে মাঝসমুদ্রে কোনও শরণার্থীদের নৌকা নজরে এলেই সেটিকে আটক করার নির্দেশ পায় লিবিয়ার বাহিনী। কিন্তু তার পরেও থেমে নেই এই পথে ইউরোপ যাওয়া।

সাভারের অন্তর আলী জমি-জমা, তিনটি গরু, স্ত্রীর গয়না বেচে সব টাকা দালালদের দেন ইউরোপ যাওয়ার আশায়। ২০১৬ সালের অক্টোবরে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশে প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইরাকে। এরপর তুরস্ক, সেখান থেকে গ্রিস। কখনও পায়ে হেঁটে, কখনও ছোট নৌকায় করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে, আবার কখনও বা ছোট্ট একটা কনটেইনারের ভেতর ঢুকে যেতে হয়েছে। ইরাকে পর্যটক ভিসা নিয়ে গিয়ে এক মাসের বেশি থাকার সমস্যা হলেও দালাল তাকে বলেছিল কোনও সমস্যা হবে না।

অন্তর আলী জানান,  যাওয়ার পথটা ছিল ভয়াবহ। প্রথমদিন দুবাই থেকে ইরাকের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর সেখানে আট ঘণ্টা থাকার পর দালাল  নিয়ে যায়। সাত থেকে আট ঘণ্টা লাগে নাজাফ থেকে বাগদাদ যেতে। তিনি বলেন, ‘বাগদাদে এক রাত থেকে কিরকুকে নিয়ে গেলো। সেখানে ছিলাম চার দিন। রাতের বেলায় কুর্দিস্তান নিয়ে যায়। সেখানে একটা কারখানায় লেবারের কাজ করি কয়েকদিন। পরে সেখান থেকে তুরস্কের উদ্দেশে আবার রওনা হতে হয়।’

অন্তর আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাতের বেলায় পাহাড়ে পাহাড়ে হাঁটা লাগতো। সে কী পাহাড়, হাঁটতে হাঁটতে পায়ের চামড়া উঠে গেছে, হাত-পা কেটে রক্ত বের হয়ে যেত। এখনও হাতে পায়ে কাটা দাগ আছে। এছাড়া হাতুড়ির আঘাতে কালো হয়ে গেছে নখ।’ তিনি বলেন, ‘এরপর এক গাড়িতে করে সাত ঘণ্টা ধরে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গেলো, সেখানে তিন দিন ছিলাম। এই কয়দিনে দিনে-রাতে একবেলা খাওয়া পেতাম, সেটাও ছিল শুকনা একটা অথবা দুইটা রুটি। ভয়ে একেকজন কুঁকড়ে যেতাম, কিন্তু কারও কিছু করার ছিল না। সেখান থেকেই গ্রিসের পথে রওনা হলাম। রাতের বেলায় নৌকায় করে নদী পার হয়ে আবার আরেক জঙ্গল। সেই নদী পার হতে নেয় এক লাখ ২০ হাজার টাকা। যে নৌকায় ১০-১৫ জন ধরার কথা সেখানে ওঠালো ৩০ জন। সেখানে বাংলাদেশিসহ অন্য দেশের লোকেরা ছিলও। ইরাক পর্যন্ত যেতে নিয়েছে চার লাখ ৪৮ হাজার টাকা। একেকটা জায়গা পার করেছে আর টাকা নিয়েছে। এভাবে মোট ১০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে দালালকে।.

তিউনিসয়ায় উদ্ধার হওয়া সিলেটের বিলালতিউনিসয়ায় উদ্ধার হওয়া সিলেটের বিলাল

গ্রিসে যাওয়ার পর ছয় মাসের বেশি থাকতে পারেননি অন্তর আলী। ইউরোপজুড়ে ঘোষণা আসলো কাগজপত্র ছাড়া যেসব বাঙালি আছে তাদের ধরা হবে। এর আগে অন্তর আলীকে দেওয়া কার্ড রিনিউ করতে গেলে ধরা পড়ে যান। সেই অফিস তাকে পুলিশে দেয়। এরপর থানায় ১৫ দিন আর জেলে দুই মাস ছিলেন অন্তর আলী। জেলে গিয়ে জানতে পারেন এরপরও যদি সেখানে থাকতে চান, তাহলে জেল হবে এক বছরের। তারপরও কোনও নিশ্চয়তা নেই থাকার। গত বছর তিনি দেশে ফিরে আসেন।

গত কয়েক বছরে কাজ করার জন্য পাল্টে গেছে ইউরোপের পরিস্থিতি। এখন আর অবৈধভাবে আসা লোকজনকে আশ্রয় দিতে রাজি নয় ইউরোপ, বরং কাগজপত্রহীন মানুষদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে।  কাগজপত্র ঠিক না থাকা বাংলাদেশিদের ফেরত আনতে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) স্বাক্ষর করেছে  বাংলাদেশ। এর আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত নিয়ে আসা হয়েছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, শ্রম অভিবাসনের নামে মানবপাচার প্রতিরোধে  সুদান, লিবিয়া ও মিশরে কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে ভিসা যাচাই-বাছাইয়ে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেওয়া আছে। এছাড়াও ভিজিট ভিসার নামে বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের জন্য থেকে যাওয়া বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সাধারণ মানুষের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। সচেতন থাকলে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ কম।

তারপরও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ যাওয়ার প্রবণতা বন্ধ না হওয়ার কারণ দুটি বলে মনে করেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা  ব্র্যাকের অভিবাসন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বৈশ্বিক এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতির কারণে থামছে না ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়া। এই মুহূর্তে লিবিয়াতে অস্থিতিশীলতার সুযোগে বহু মানবপাচারকারী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। অস্থিতিশীলতার কারণে অরক্ষিত হয়ে আছে লিবিয়ার সীমান্তগুলো। সে কারণে আন্তর্জাতিক মানবপাচারচক্র ইউরোপে ঢোকার জন্য এই জায়গা ব্যবহার করছে। তাছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উদ্বাস্তুরাও এই পথ দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে।.

ইউরোপ যাত্রা করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এক বাংলাদেশিইউরোপ যাত্রা করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এক বাংলাদেশি

বাংলাদেশে যুদ্ধাবস্থা না থাকলেও বাংলাদেশিরা কেন এদের সঙ্গে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে শরিফুল হাসান বলেন, ইতালিতে প্রবেশ করা মানে হচ্ছে ইউরোপের ২৬টি দেশে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া। বাংলাদেশি অনেকেই আছেন ইতালিতে কাজ করেন। কিন্তু যে যায় সে এই আশ্বাসে যায় যে তার বন্ধু, আত্মীয় সবাই ঠিকঠাক আছেন এবং যেকোনো মুল্যে সেদেশে যেতে উৎসাহ দেন। প্রত্যকেই চিন্তা করে হয়তো বেঁচে যাবো। বাংলাদেশিদের এই যে একটা মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা –‘যে কোন মূল্যে বিদেশ চলে যাবো’ এটা যদি ভাঙ্গা না যায় তাহলে বন্ধ করা সম্ভব না। কারণ ইউরোপ আগের অবস্থায় নেই। অবৈধভাবে গেলে কাজ পাওয়া যায় না। তাই এই বার্তা সবার কাছে পৌঁছানো উচিত যে কাগজপত্র ছাড়া ইউরোপ গেলে হয় জেলে যেতে হবে বা ফেরত আসতে হবে।

শরিফুল হাসান বলেন, ইউরোপের পথে কিন্তু গরীব মানুষ যায় না। কারণ এতে ৮ লাখ টাকার বেশিও খরচ হয়। যারা যায় তাদের আর্থিক অবস্থা একেবারে খারাপ না। যারা এতো টাকা খরচ করে এভাবে ইউরোপ যায় তারা কিন্তু চাইলে দেশে ওই টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসা করতে পারে।

Share:

আপনার মতামত প্রদান করুন ::