সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ১২:১৪ অপরাহ্ন
ঘোষণা:
কক্সবাজার পোস্টে আপনাকে স্বাগতম, আমাদের সাথে থাকুন,কক্সবাজারকে জানুন......

জীবিকার অনিশ্চয়তা তাড়া করছে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল শ্রমিকদের

শাহীন মাহমুদ রাসেল:

প্রকাশ: এপ্রিল ৪, ২০২১ ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ | সম্পাদনা: এপ্রিল ৪, ২০২১ ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজার শহরের একটি তারকা হোটেলে কাজ করত শহীদ (ছদ্মনাম)। স্ত্রী বাচ্ছা নিয়ে বেশ ভালোভাবেই পরিবার চলত তার আয়ে। তবে বেতনের অংক অনুপাতে জীবন যাত্রার মান রাখতে গিয়ে সঞ্চয় তেমন নেই। আর্থিক সচ্ছলতা থাকায় তার বিশ্বাস আর স্বপ্ন ছিল চাকরি করে বাচ্ছাটাকে ভালোভাবেই পড়াশোনা করাতে পারবে। কিন্তু কোভিড-১৯ তার জীবনে প্রলয় তুলে দিয়েছে। কক্সবাজারের পর্যটন স্পট লকডাউনের পর থেকে চাকরি নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়।

সার্বিকভাবে কক্সবাজারের পর্যটন জোন স্থবির হয়ে গেছে। ব্যবসা বাণিজ্য কবে স্বাভাবিক হবে তা কেউ জানে না। এ অবস্থায় শহীদদের বেতন অনিয়মিত হয়েছে। তার অনেক সহকর্মী এখন জবলেস। স্বল্প সঞ্চয় দিয়ে পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। দৈনন্দিন জীবনের চাহিদাকে কাটছাট করতে গিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে বাচ্চার কাছে। শহীদদের চাকরিটা থাকবে কিনা তাও এখন বলা মুশকিল। সব মিলিয়ে তার এ করুণ দশা কাউকে বলা সম্ভব না সামাজিক মর্যাদার কারণে। চাইলেও কারো কাছে হাত পাতা সম্ভব নয়। চকরিটা চলে গেলে নতুন করে কবে চাকরি পাবে তা বলা যায় না।

জানা গেছে, করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলসহ সব পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। এছাড়াও আগামী সোমবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য লক ডাউন ঘোষনা করেছে সরকার। এই অজুহাত দেখিয়ে তারকা হোটেলসহ বিভিন্ন হোটেল-মোটেলে খরচ কমাতে, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পথেই হাঁটছে কতৃপক্ষ। এই পরিস্থিতিতে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে আতংকের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

শহীদদের মতো পরিস্থিতিতে আছে এখন হোটেল-মোটেল জোনের সহস্রাধিক কর্মচারীরা। কোভিড-১৯ এর অজুহাত দেখিয়ে তাদের মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে রোজগারের পথ রুদ্ধ করে কতৃপক্ষ নানা ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।

হোটেল-মোটেল জোনের প্রায় এক তৃতীয়াংশ কর্মচারী কর্মহীন হবার শঙ্কায় ভুগছে। কেউ চাকরি হারিয়ে পরিবার নিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। তবে কর্মসংস্থান ছাড়া বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য খরচ মেটানো সম্ভব নয়। হঠাৎ সব কিছুই বদলে গেছে। এখন কোনভাবে বেঁচে থাকাটাই মুখ্য বিষয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছর করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতে করোনার অজুহাতে চাকুরী হারানো শ্রমিকের অধিকাংশই আজ পর্যন্ত নিজ কর্মস্থলে ফিরে আসতে পারেনি। অল্প সংখ্যক যারা কাজে ফিরছিলেন তাদের মজুরী ও পাওনা পরিশোধ না করেই এবার শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই শুরু করেছে হোটেল মালিক কর্তৃপক্ষ। গত কয়েকদিনে শহরের কলাতলীর হোটেল-মোটেল জোনের প্রায় কয়েক শত কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আবার কোন কোন হোটেল কতৃপক্ষ ইতিমধ্যে সিন্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে কর্মচারীদের জোরপূর্বক ছুটিতে পাঠানোর নাম করেই চাকরিচ্যুত করা।

তারমধ্যে অনেকের বেতন দেয়নি মালিক পক্ষ। কবে দেবে, তারও কোনও ঠিকঠিকানা নেই। উল্টো হোটেল মালিক পক্ষের নয়া ফরমানে কাজ হারানোর আশঙ্কায় অনেকেই। এই পরিস্থিতিতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে হোটেল শ্রমিকদের।

এমনকি গতবছর বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক প্রনোদনা দিলেও এক অজানা কারনেই হোটেল রেস্তোরাঁর প্রায় ২০ হাজার কর্মী সরকারি প্রনোদনা থেকে বঞ্চিত ছিল। সে সময় শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে কথা বলায় জেলা প্রশাসক কামাল হোসেনের বিরাগভাজন হয়েছিলেন হোটেল মালিক সমিতির একাধিক নেতা।

গত বছর করোনার শুরু থেকে দীর্ঘ পাঁচমাস কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল ও পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ ছিলো। এই সময়ে অধিকাংশ মালিক তাদের শ্রমিক-কর্মচারীদের কোন বেতন দেননি। এতে অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন তারা। আশা ছিলো করোনা কাটিয়ে নতুন করে শুরু হলে পাল্টে যাবে পরিস্থিতি। খুব ভালভাবেই জমে উঠেছিলো পর্যটন ব্যবসা। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গে ব্যবসাও করেছেন হোটেল-মোটেলগুলো। ব্যবসার মৌসুম শেষে করোনার অজুহাত দেখিয়ে অনেক হোটেল শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চাকরিচ্যুত একজন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি হোটেল-মোটেল জোনে চাকরি করেছেন। ১৪ দিনের লকডাউন এবং করোনার কারণে মালিক চালাতে পারছেন না অজুহাত দেখিয়ে তিনিসহ অনেককে ছাঁটাই করা হয়েছে। হঠাৎ চাকরিচ্যুত হওয়ায় তিনিসহ প্রত্যেকে পড়েছেন বিপদে। এখন রিজিকের মালিক ছাড়া কোন উপায় নাই। একই অভিযোগ করেছেন চাকরিচ্যুত অন্যান্য শ্রমিক-কর্মচারীরা।

তারা বলেন, গত কয়েক মাসে হোটেল মালিকেরা কয়েকগুণ ব্যবসা করেছে। এখন তাদের লোকসান হয় না। তারপরও তারা নানা অজুহাতে শ্রমিক ছাঁটাই করে তাদের বিপদে মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। পরিবার পরিজন নিয়ে তারা মানবেতর পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন বলে জানান।

এবিষয়ে কক্সবাজার গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি ওমর সুলতান জানান- এক সপ্তাহ বা এক মাসের লকডাউনের অজুহাতে কর্মী ছাঁটাই করা অমানবিক। লকডাউন দীর্ঘস্থায়ী হলেও কর্মী ছাঁটাই করার প্রয়োজন পড়বে বলে মনে হয় না। দুঃসময়ে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের ছাটাই করা একেবারে অমানবিক।

তিনি আরও বলেন- হোটেল মালিকরা কক্সবাজার থেকে ব্যবসায় যে পরিমাণ মুনাফা অর্জন করে থাকেন এমনিতেই বছর খানেক বেতন চালিয়ে নিতে পারবেন। তিনি নিজেও গেলো বছর করোনা মহামারী শুরু হলে তার দুটি হোটেলে কোনো কর্মচারী ছাঁটাই করেননি বলে জানান।

কলাতলী হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মুকিম খান জানান- দুঃসময়ে শ্রমিকরা বঞ্চিত হউক এটা চাই না। কোনো হোটেল মালিকের পক্ষ থেকে এধরণের আচরণ কাম্য নয়। এমনিতেই কক্সবাজারের পর্যটন ভিত্তিক যে ব্যবসা মৌসুম তা এখন শেষের দিকে। সুতরাং যার যতটুকু ব্যবসা করার করে নিয়েছে। এই সময় অনেক কুমতলবী মালিক কর্মী ছাঁটাই করে। এটা উচিত নয়।

এর উপর আবার লকডাউন পড়ায় এটাকে কেউ কেউ অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে চাইবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সামান্য সময়ের লকডাউনের জন্য কর্মী ছাটাই করার প্রয়োজন পড়ে না। তবুও যদি কেউ এমন গর্হিত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তাহলে এটা নিজেদের পায়ে কুড়াল মারার মতো হবে। কারণ কক্সবাজারে শ্রমিক সংগঠনগুলো তাদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে আগের চেয়ে বেশি সক্রিয়।

কক্সবাজার পোস্ট.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
কক্সবাজার পোস্ট সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ
এই জাতীয় আরো খবর::