তারিখ: বুধবার, ২২শে মে, ২০১৯ ইং, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Share:

রফিকুল ইসলাম :
মোঃ জাবের, মিয়ানমারের উত্তর রাখাইনের মংডু জেলার বলি বাজার থানার বাসিন্দা। দেশে থাকতেও বলি বাজারে বড় দোকান করে জীবন চালাতো। ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্টের পর ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা আগমনে সে ও পরিবার পরিজন নিয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় উখিয়ার কুতুপালং মেগা ক্যাম্পের ৯ নং বালুখালী ক্যাম্পে।
বালুখালী পান বাজার হয়ে ক্যাম্পে প্রবেশের মূখে খুলে বসেছে বিভিন্ন ধরণের পাইকারী কাপড়ের দোকান। বাংলাদেশী নানা ধরনের কাপড়ের পাশাপাশি মিয়ানমারের বিপুল পরিমাণের কাপড়ের মজুদ তার দোকানে। উখিয়া ও টেকনাফের ৩২ টি ক্যাম্পে মোঃ জাবেরের মত অসংখ্য বড় দোকান রয়েছে। এসব দোকানের প্রায় সবগুলোর মালিক উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা। ছোট ছোট দোকানের সংখ্যা অগনিত।
স্থানীয়ভাবে জনশ্রুতি রয়েছে ক্যাম্প গুলোতে যতগুলো ঘর, রয়েছে ততগুলো দোকান। একেবারে পান,বিড়ি- সিগারেটের দোকান থেকে বড় বড় যে কোন ধরণের পণ্যের পাইকারি দোকান রয়েছে শত শত।
একেকটি পাইকারি দোকানে দৈনিক বিক্রি বাংলাদেশী লক্ষ লক্ষ টাকার মালামাল। ক্যাম্প গুলোতে রয়েছে অসংখ্য কম্পিউটার, মোবাইল ডিভাইসের দোকান। যেগুলোতে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশী জাতীয় পরিচয় পত্র, জন্ম নিবন্ধন জালিয়াতি করে রোহিঙ্গাদের নামে ভূঁয়া এনআইডি ও জন্ম নিবন্ধন পত্র বানিয়ে তা নিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। এছাড়াও এসব ভূঁয়া এনআইডি ও জন্ম নিবন্ধন পত্র নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট বানিয়ে বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে ও চলেও যাচ্ছে অনেক রোহিঙ্গা।
ওষুধের দোকান গুলোর আড়ালে রোহিঙ্গা ও স্হানীয় কিছু মাদক ব্যবসায়ী ভেজাল ওষুধ ও ইয়াবা ট্যাবলেটের ব্যবসা চালানোর অভিযোগ স্হানীয় লোকজন ও সাধারণ রোহিঙ্গাদের। ক্যাম্প গুলোতে অন্তত পাঁচ শয়ের মত ওষুধ দোকান রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এসব ওষুধ দোকানে ভেজাল ও নিন্ম মানের ওষধই বেশী বেচা কেনা চলে। অথচ রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তর,বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সহ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্হা, বিদেশী ও দেশী এনজিও গুলোর দুই শতাধিক হাসপাতাল, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র,মোবাইল ক্লিনিক রয়েছে।
উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ আবদুল মান্নান বলেন ক্যাম্প গুলোতে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সেবার জন্য ১৯৩ টির মত হাসপাতাল, প্রাথমিক হেলথ সেন্টার ও হেলথ পোস্ট রয়েছে। মূলত ওষুধের দোকান ও এগুলোর পরিচালনার বিষয় গুলো ওষুধ প্রশাসন তদারকি করে থাকেন। সেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তেমন কোন ভূমিকা নেই বলে জানিয়ে তিনি বলেন রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে যত্রতত্র ওষুধের দোকানে নিন্মমানের ও ভেজাল ওষুধ বিক্রি হচ্ছে অহরহ।
স্বর্ণের দোকান রয়েছে কয়েক শত।২০১৭ সালের ২৫ আগষ্টের পূর্বে বর্তমান রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার ভিতর ও সংলগ্ন আশ পাশের এলাকায় তেমন কোন স্বর্ণের দোকান ছিল না। এখন ঐসব রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে গজে উঠেছে কয়েক শত স্বর্ণের দোকান। এসব স্বর্ণের দোকানের আড়ালে চলছে মিয়ানমারের সঙ্গে বেআইনি ভাবে স্বর্ণ চোরাচালান, বিদেশের সাথে হুন্ডি ও মুদ্রা পাচার সহ চড়া সুদের রমরমা বাণিজ্য। ইতিপূর্বে কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু স্বর্ণ ও ওষুধের দোকান বন্ধ করে দেওয়া হলেও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান।
এছাড়াও ক্যাম্প গুলোতে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাজার। এসব বাজার, দোকান গুলোর মালিক রোহিঙ্গারা। তাছাড়া ক্যাম্প গুলোর অভ্যন্তরে সংযোগ সড়কগুলোতে ও কক্সবাজার – টেকনাফ সড়কের উখিয়ার কুতুপালং থেকে বালুখালী, থাইংখালী, পালংখালী, হোয়াইক্যং পর্যন্ত প্রায় ২০ কিঃমিঃ মহাসড়কে চলছে শত শত সিএনজি অটোরিকশায় ও টমটম ইজিবাইক। এসব অটোরিকশা ও টমটমের অধিকাংশ মালিক ও চালক রোহিঙ্গা। এধরনের আনাড়ি চালকের কারণে যানজটের পাশাপাশি বেড়েছে দুর্ঘটনাও। উখিয়া সিএনজি, মাহিন্দ্রা, টমটম মালিক-শ্রমিক সমিতির মোক্তার চৌধুরী রোহিঙ্গাদের হাতে অনেক সিএনজি অটোরিকশায়, টমটম ইজিবাইক, আনাড়ী রোহিঙ্গা চালকদের কারণে দূর্ঘটনাও বেড়েছে জানিয়ে বলেন, সড়কের বিশৃঙ্খলা দমনে ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
উখিয়ার দারোগা বাজারের বড় পাইকারি ব্যবসায়ী সিরাজ সওদাগর, প্রদীপ সেন বলেন, এখানকার আড়াই লক্ষ জনসংখ্যার পাশাপাশি অতিরিক্ত আরো প্রায় নয় লক্ষ রোহিঙ্গার অবস্থান হলে বাবসা বাড়েনি বরং কমেছে। কারণ ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় অসংখ্য দোকান পাঠ। আমরা বৈধভাবে বিভিন্ন প্রকারের ট্যাক্স, দোকান, গুদাম ভাড়া ও জামানত দিয়ে ব্যবসা করলেও অনিয়ন্ত্রিত রোহিঙ্গাদের কারণে ব্যবসা লোকসানের দিকে বলে তারা জানান।
কোট বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আদিল উদ্দিন চৌধূরী বলেন, সহায়,সম্পদ, জায়গা জমি,বন,পাহাড়, পরিবেশ সব কিছু দিয়ে এখানকার মানুষ নিঃস্বের পথে। দরিদ্র লোকজনের শ্রম বাজার অনেক আগেই রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে। নিন্ম ও মধ্য বিত্তরা স্থানীয়ভাবে কিছু দোকান পাঠ করে কোন মতে সংসার চালাতো। কিন্তু বর্তমানে সেটিও রোহিঙ্গাদের কব্জায়। কার্যত এখানকার সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এখন রোহিঙ্গাদের দখল ও নিয়ন্ত্রনে বলা চলে বলে তিনি জানান।
উখিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন,রোহিঙ্গাদের মানবিক বোধ থেকে আশ্রয় দিয়ে সব কিছু বিনা মূল্যে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আশ্রয় প্রার্থীরা স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড জড়িয়ে পড়া অশনি সংকেত। যত দ্রুত সম্ভব এ গভীর সংকট থেকে উত্তরণ প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

Share:

আপনার মতামত প্রদান করুন ::