তারিখ: মঙ্গলবার, ১৮ই জুন, ২০১৯ ইং, ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Share:

রশিদা আক্তার (ছদ্মনাম) বয়স ২০ বছর। স্বামীঃ শমসু আলম(৪০বছর)(ছদ্মনাম)।

বর্তমানে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের অধিবাসী। প্রায় দেড় বছর হলো মায়ানমার থেকে পাড়ি জমিয়েছে রশিদা এবং তার জ্ঞাতিগোষ্ঠীর অনেকেই বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার শফিউল্লাহ কাটা নামক একটি শরনার্থী ক্যাম্পে।

১৯৯৯ সালে রশিদা আক্তার জন্মগ্রহন করেন বার্মার টংবাজার থানার,নারায়ন সংঘায়ন এলাকার কিনোচি পারা গ্রামে। রশিদা আক্তার এর ২ ভাই ২বোন।বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান তিনি। পারিবারিক স্বচ্ছলতা থাকলে ও রোহিংজ্ঞা এবং মুসলিম হওয়ার কারণে পড়ালেখা করতে পারেননি রশিদা আক্তারের কোন ভাই বোনই। কোন রকমে ৫ ক্লাস পর্যন্ত পড়ালেখা করার সুযোগ হয়েছিলো তার এবং তার ভাইবোনদের। রশিদা আরো জানায়, তাদের ছেলেমেয়েদের ও পড়ালেখা করাতে পারেননি।

কারন বার্মায় তাদের কলেজে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিলো। তিনি বলেন, আমার ১৬ বছরের ভাই আজ কলেজে পড়তো। কিন্তু রোহিঙ্গা হওয়ার জন্য কলেজে পড়তে যাওয়ার কোন সুযোগ ছিলো না। কলেজে পড়তে হলে মোটা অংকের টাকা দিতে হতো মগদের। মাত্র ১৬ বছর বয়সে আলাদা পাড়ার শমসু আলমের সাথে বিয়ে হয় রশিদার। শমসু আলমের ৬ কানি জমি,ভিটেবাড়ি,গরু,ছাগল সকল কিছুই ছিলো। খুব ভালোই চলছিলো সংসার।

রশিদা জানায়, মায়ানমারে তারা অনেকদিন আগ থেকেই নির্যাতিত। তাদের রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচয় দেয়া হতোনা। তাদের ডাকা হতো “বাঙ্গালী কলা” বলে। কারন হিসেবে রশিদা বলেন মগেরা মদ খেতো,জুয়া খেলতো,মানুষ মারত, নারীদের উপর অত্যাচার করতো রোহিংজ্ঞারা এসব করতো না তাই তাদের বাঙ্গালী কলা বলে ডাকত।মূলত তাদের থেকে আলাদা করার একটা পায়তারা বহু দিন থেকেই তারা চালাচ্ছিলো।

তবে রশিদা এটি ও জানায় যে, অনেক রোহিঙ্গা ছিলো মগদের সাহায্য করতো। কেন করতো কিভাবে করতো এই সম্পর্কে রশিদা তেমন কিছু জানেনা বলেই উল্লেখ করেন।

এরকম নির্যাতনের মাঝে কোন রকম দিন কাটাচ্ছিলাম কিন্তু ২০১৫ সালের কুরবানী ঈদের ৭ দিন আগেই হঠাত করে মগদের এই অত্যাচার বেশি হয়ে যায়। তারা লুটপাট শুরু করে দেয়। মায়ানমার আর্মি,হিন্দু জনগোষ্ঠী,মগ সকলে মিলে এই হত্যাকান্ড চালায়। একদিন হিন্দুরা পায়জামা,পাঞ্জাবী পরে মুখ বেধে মগদের ঘরে ঘরে গিয়ে রাতের আধারে অত্যাচার করেছিলো বলে শুনেছি।

পরেরদিন মগেরা বলে এই অত্যাচার করেছে রোহিংজ্ঞারা। তারপর থেকে মগেরা একটা পাড়ায় ঢুকত,আর্মিরা পুরা পাড়া ঘেরাও করে রাখতো। আর মগেরা ঘর ঘর গিয়ে যুবতী মেয়ে থাকলে ধরে নিয়ে যেতো, ছোট ছোট বাচ্চাদের মেরে ফেলতো, হামিল মহিলাদের পেট ফেড়ে দিতো ছুড়ি দিয়ে। এরপর সোনা,টাকা পয়সা,গরু লুট করে নিয়ে সকলের হাত বেধে আগুন লাগিয়ে দিতো। এভাবে গ্রামকে গ্রাম যখন পোড়ানো শুরু করেছিলো তখন আমরা ৪দিন দেখেছিলাম তারপর ৫দিনের সময় ভোর ৪টায় রওনা হয়েছিলাম বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে।

যখন রওনা দিয়েছিলাম তখন জানতাম না আসলে বাচবো কিনা বা কোথায় যেতে পারবো। অনেকটা উদ্দেশ্যহীন ভাবেই চার ছেলে সন্তান, মা এবং স্বামী নিয়ে এরকম মোট ৬ পরিবার মিলে প্রায় ৫০ জনের মত আমরা একসাথে রওনা দিয়েছিলাম। প্রায় ৭দিন ৬ রাত পর বাংলাদেশের কুতুপালং এসে পৌছাই। সেখানে তিনদিন থাকার পর শফিউল্লাহ কাটার একটি স্থানীয় পরিবারের সাথে ছিলাম কিছুদিন।

তারপর ক্যাম্প ১৬ তে এসেছিলাম। নিজের পরণের একটি বোরখা দেখিয়ে তিনি বলেন এই বোরখা দিয়েছিলো আমাকে ঐ পরিবারের এক আপা যা এখনো ব্যবহার করছি আমি। ৭দিন ৬ রাতের বাংলাদেশ যাত্রা আপনাদের জন্য কেমন ছিলো জানতে চাইলে উত্তরদাতা জানান, আমরা প্রায় ৫০ জন মিলে একসাথে এসেছিলাম যার মাঝে বৃদ্ধ এবং শিশু ছিলো। সারাদিন হাঁটতাম। কত যে বন জংগল,পাহাড় পাড়ি দিতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। আমার ছোট ছেলের বয়স ছিলো ১ বছর তাকে কোলে নিয়ে হাটতে হাটতে আমার স্বামীর কোমড় ভেঙ্গে গিয়েছিলো। এখনো সে হাটতে পারেনা ঠিকমত। আমার বৃদ্ধ মা এখানে আসার ১২ দিনের মাথায় মারা গিয়েছে ঠান্ডা, জ্বর আর শরীর দূর্বলতার কারনে। আসলে বুড়ো মানুষ এত দূর হাটার ধকল নিতে পারেননি।

তিনি আরো জানান, আমরা ৫০ জন একসাথে রওনা করেছিলাম যার মাঝে ৪ জন মারা গিয়েছিলো। ২জন ছিলো শিশু(৪মাস) বয়সের মত হবে। মায়ের কোলেই মারা যায়। প্রচন্ড গরম ছিলো খাবার পানি তেমন পাওয়া যেতোনা। যা নিয়ে এসেছিলাম ২ দিনেই শেষ। এরপর পাহাড় থেকে ঝর্নার পানি,ডোবার পানি যা পেতাম তাই খেয়েছিলাম। আর ১ জন বৃদ্ধ মহিলা এবং ১ জন পুরুষ মারা গিয়েছিলো। কেউ মারা গেলে কি করতেন তাদের? কোম্বল বা চাদর বা শাড়ি দিয়ে জড়াইয়ে রেখে দূরে ফেলে দিয়ে এসছিলাম। বলতে বলতেই অঝোর ধারায় কান্নায় ভেঙ্গে পরেন উত্তরদাতা।

তাকে কিছুটা শান্ত করার পর তিনি আবার বলতে শুরু করেন। লক্ষ্য করেছিলাম তিনি আপন মনেই অনেক কিছু বলে যাচ্ছেন। যখন বের হয়েছিলেন তখন কি কি নিয়েছিলেন? মরিচ বেটে নিয়েছিলাম যেনো ভাত খেতে পারি, আবার পথে কোন সমস্যায় পড়লে অস্ত্র হিসেবে ও ব্যবহার করা যায় বলে মন্তব্য করেন উত্তরদাতা।আসলে যুগ যুগ ধরেই প্রতিটি সমাজ ও সংস্কৃতিতে লোকজ জ্ঞান বা কৌশল আছে যা নারীরা সিদ্ধ হস্তে ব্যবহার করে আসছে। একটু ভাত রান্না করে নিয়েছিলাম। ২ কেজির মত চাল। কিছু শুকনা খাবার আর পানি। তিনি আরো জানান, এই ৭ দিনে একবার রান্না করেছিলাম।

রাত হলে কি করতেন জানতে চাইলে উত্তরদাতা বলেন, সবাই মিলে একসাথে জড়ো হয়ে বসে থাকতাম, চারদিকের খড়কুটো একসাথে করে আগুন লাগিয়ে দিতাম। আবার ভোর বেলা রওনা করতাম।

উত্তরদাতা বলেন, কখনো ভাবিনি এই বাংলাদেশে এসে পৌছাতে পারবো। যখন বের হয়েছিলাম তখন ভেবেছিলাম মরবো কি বাচবো জানিনা??? আল্লাহর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নিজের সব কিছু ফেলে আসতে অনেক কষ্ট হচ্ছিলো। আমার প্রায় ৩০০ মণ আলু মাঠ থেকে তোলার উপযোগী হয়েছিলো ,১০ টা গরু রেখে এসেছি।রশিদার চোখের জল থামছেনা, শান্ত করছিলাম আপা,আজ থাক অন্য একদিন কথা বলবো। কিন্তু রশিদা থামছিলেন না। আপন মনেই বলে যাচ্ছিলেন। তিনি জানান, যখন চলে আসি আমার গরুগুলোর চোখের জল গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছিলো,হাম্বা,হাম্বা বলে চিৎকার দিচ্ছিলো।

নিয়ে আসার চেষ্টা করেননি, জবাবে বলেন, আমাদের অনেক দূর থেকে আসতে হয়েছিলো। তাছাড়া একটা বিশাল খোলা মাঠ পাড়ি দিতে হয়েছিলো যেখানে মগেরা থাকতো ওরা জোর করে তাদের ডেরায় নিয়ে যাইতো। তাই আর নিয়ে আসিনি। রাস্তায় কোন ধরনের সমস্যা বা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন কি, জানতে চাইলে উত্তরদাতা বলেন, সাপ আর চিনা জোকের ভয় ছিলো। কিন্তু যারা কিশোরী বয়সের ছিলো তাদের অনেককেই ধরে নিয়ে গিয়েছে। জুলুম,নির্যাতন করেছে।

তিনি আরো বলেন, এখনো বার্মায় মগদের ডেরায় প্রায় প্রতি গ্রাম থেকে ৩০থেকে ৪০ জন করে যুবতী মেয়ে আছে। যাদের তারা ধরে নিয়ে গিয়েছিলো চলে আসার সময়। মোট সংখ্যা কত হবে জানতে চাইলে উত্তরদাতা বলেন, প্রায় ১০০০ এর মত।

বার্মায় আপনাদের বিচার আচার কেমন করে হতো জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপা ঐখানে গ্রামের মাতব্বর ছিলো যাদের চেমু,রাইমু এসব নামে ডাকা হইতো। তারাই বিচার করতো। কিন্তু বিচার হইতো টাকার বিনিময়ে। জমি নিয়ে ঝামেলা বেশি হইতো। আর যারা টাকা দিতে পারতো বিচার তাদের দিকেই যাইতো। তবে ঐখানে একটা মানবাধিকার সংগঠন ছিলো। নাম জানতে চাইলে কিছু বলতে পারেননি উত্তরদাতা।

তারা আমাদের অনেক সচেতনতামূলক কথা যেমন বাল্যবিবাহ দেয়া যাবেনা, তার ক্ষতিকর দিক এগুলো বলতো। এখনকার মতো সুযোগ সুবিধা কি পেতেন ঐখানে।উত্তরদাতা বলেন, না, এইখানে তো সবকিছুই দেয় কিন্তু ঐখানে এসব দিতো না। কিন্তু ঐখানে অবৈধ কোন প্রেম,মহব্বত মেনে নিতোনা। আর সেটা যদি ১৮ বছরের নিচে হতো তাহলে দুজনকে আলাদা করে দিতো অনেকক্ষেত্রে মেয়েকে মগের বাংকারে ধরে নিয়ে যেতো আর ছেলেকে মেরে ফেলতো।এখানে আসার পর খুব ভালো আছি বলে উল্লেখ করেন উত্তরদাতা।

নিজেকে রোহিঙ্গা শরনার্থী হিসেবে ভাবতে আপনার কেমন লাগে জবাবে উত্তরদাতা বলেন, রোহিঙ্গা নামটা আমার ১৪ পুরুষ থেকে চলে আসছে।এটা বংশানুক্রমিক। কিন্তু আমরা শরনার্থী হতে চাইনা। হতে চাই রোহিঙ্গা মুসলিম। কিন্তু আমাদের বার্মাতেও এই রোহিঙ্গা মুসলিম নামে ডাকা হতো না। বলা হতো বাঙ্গালী কলা। মুসলিম দেখলেই মগ,আর্মিরা খারাপ আচরণ শুরু করতো। বাংজ্ঞালী বলে আমাদের আলাদা করতো। কিন্তু আমরা তো বাঙ্গালী না আমরা রোহিংজ্ঞা মুসলিম। আমাদের বার্মায় একটা আইডি কার্ড দেয়া হয়েছিলো যেখানে ও রোহিঙ্গা মুসলিম লিখা নাই। আমাদের বাঙ্গালী মুসলিম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে আসার পর ভালো আছেন তাহলে এখান থেকে ও অনেকে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে কেন, উত্তরে জানান সবাই তো আর এক না। হয়তো আরো বেশি ভালো থাকার লোভ আর টাকার লোভে অন্য কোথাও যাচ্ছে।

আপনি কি বার্মায় ফিরে যেতে চান, জবাবে উত্তরদাতা বলেন, হ্যাঁ, যেতে চাই, আপনারা তো সারাজীবন এভাবে রাখতে পারবেন না। তাছাড়া শরনার্থী হিসেবে থাকতে কার ভালো লাগে? সবাই দয়া করে। কিন্তু আমার সব ছিলো অন্যের দয়ার দরকার ছিলোনা। কিন্তু আমাদের পরিচিতি দিতে হবে। রোহিঙ্গা মুসলিম হিসেবে। আমাদের চাহিদা গুলো পূরণ করতে হবে, নিরাপত্তা দিতে হবে।

রশিদার চোখের জল প্রমান করে “শরনার্থী “হওয়ার যন্ত্রণা, অভিযোগ, অভিমান।রোহিঙ্গা একটি জাতি। হতে পারে মুসলিম, হতে পারে বৌদ্ধ, হিন্দু,খ্রিস্টান কিংবা আম,কলা যাই হউক না কেন মানুষ তো! কথায় আছে “সবার উপরে মানুষ সত্য তার উপরে নাই”। তাহলে কেন বিশ্ব রাজনীতির যাতাকলে পিষ্ট হয়ে খুব নির্দিষ্ট করে বললে ট্রাম্প /ওবামা-সুচির রাজনীতির বলিদান তারা হবেন???? কি দোষ তাদের??? তারা মুসলিম??? আর তাই বিশ্বজুড়ে এক ধর্মকে (যার দৃশ্যমান কোন অস্তিত্ব নাই) কেবল বিশ্বাসের ভিত্তিতে স্বর্গের লোভে কেনো এতো এতো হত্যাযজ্ঞ,কেনো এতো রাজনীতি???? আজ নিউজিল্যান্ড,কাল নেদারল্যান্ডস,তো পরশু অন্যখানে।আসুন না ভাই,বোনেরা একটু মানবিক হই, সবাইকে মানুষ ভাবি।।সকলের ধর্মকে শ্রদ্ধা করি,সম্মান করি,স্বাধীনতা দেই শান্তিপূর্ণ ধর্ম পালনের।ধর্মে ধর্মে ভেদাভেদ নয়, রক্ত কাটুন সবারই লাল। সবাই মানুষ।
পরিশেষে বিশ্বরাজনীতির মূলহোতাধরগণ মানুষ নিয়ে খেলা বন্ধ করুন। মানবিকতার রাজনীতি বন্ধ করুন। নয়তো এমন দিন ও আসবে যেদিন দাবার চাল পালটে গেলে ও যেতে পারে।

জয় হউক মানবতার জয়
ভেংগে চুরমার হউক উঁচু নিচু বন্ধুর পথগুলো
মিলিত হউক একই সরলরেখায়।

জিনাত নেছা
উন্নয়নকর্মী ও গবেষক।
.

Share:

আপনার মতামত প্রদান করুন ::