তারিখ: সোমবার, ৯ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Share:

আমাদের “খুশি” তাদের অখুশি
আমাদের বিশ্বপ্রেম তাদের ঘৃণা।

শুরুতে শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন কালো- ধবল, মিশুক- হিংশুক, ধনী- গরীব, অধিজন- ঊনজন, সাধু- লম্পট, সতী-বেশ্যা, নামে- বেনামে ধার্মিক, ধর্মভীরু- ধর্মহীন আরও যত কিসিমের মানুষ আছেন। একজন মানুষ আপনাদের ভালোবাসা বিলাচ্ছে আপনারা কৃপা করে গ্রহণ করুন।

চণ্ডীদাস বলেছেন
“সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই। ”

তাই মানুষের বন্দনা করি।
এই মানুষ হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, খ্রিস্টান নয়, বৌদ্ধ নয়, কেবল প্রাণের অস্তিত্ববান মানুষ মাত্রই বন্দনা করি।

সৃষ্টিকর্তা ধর্ম সৃষ্টি করেন নি মানুষ সৃষ্টি করেছেন,
তিনি রাষ্ট্র সৃষ্টি করেন নি দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন।
কাজেই বিধর্মী- বিরাষ্ট্রী, ধার্মিক- ধর্মহীন মানুষ মাত্রই তাঁর সৃষ্টি। এই সৃষ্টিকে তুচ্ছ করা, ঘৃণা করা মানেই খোদার খোদায়িত্বে আঘাত করা।

তাই ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতিভেদ না করে খোদার সৃষ্টিকে ভালোবেসে যাই। যাদের হৃদয়ে মানব প্রেম নাই তার হৃদয়ে খোদা প্রেম থাকাটা ভণ্ডামি, কপটতা, বাতুলতা।
ক্ষুদার্থের মাঝে, তৃষিতের মাঝে, শোষিতের মাঝে খোদা বিদ্যমান।

লালন বলেছেন
“মানুষ ভজিলে সোনার মানুষ হবি। ”

প্রিয় পাঠক, এবার আমার পরাণে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকা অনুভূতি খোলাসা করবো আপনাদের ধৈর্য আমাকে বাধিত করবে।
নিচে যে ছবিটি দেখতে পাচ্ছেন এটি একটি মানুষের ছবি। মানুষটির একটি নাম আছে, রহিমা আকতার খুশি
(নিজ পছন্দের অপর নাম “রাহি খুশি”) এই নিজ পছন্দের নামের জন্য নাক সিটকানোর আগে ভাবুন আমরাও নাম নিয়ে কম আয়োজন করি তা নয়।

এই মানুষ আপনার-আমার সৃষ্টিকর্তা দরদ দিয়ে সৃষ্টি করে অন্য গ্রহে না পাঠিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন কারন এখানে মানুষ আছে। মানুষের বিপদে মানুষ পাশে থাকবে, মানুষকে ভালোবেসে মানুষ খোদার সন্ধান পাবে।
আপনারা ইতিমধ্যেই এই নাম পড়ে আমার মনোবাসনা ঠাহর পেয়েছেন কিন্তু আরেকটু সবুর করুন।

রহিমা আকতার খুশির জাতি পৃথিবীর যে কয়টি নিপীড়িত জাতি আছে তার মধ্যে অন্যতম নির্যাতিত এবং অবহেলিত জাতি। এই জাতির ক্যারিশমাটিক অভিভাবক নেই, নেই বিপদে পিঠ লাগিয়ে দেওয়া আত্মীয় জাতি। তাই সুদীর্ঘ সময় ধরে এই জাতিকে নিয়ে কুকুর-বিড়াল খেলা হয়েছে এবং হচ্ছে।
আপনারা অবগত হয়েছেন খুশির মা- বাপ ও অনেকের মতো ওই কুকুর -বিড়াল খেলার শিকার হয়ে একটু সুখের আশায়, ভালোমতো বেঁচে থাকার অাশায় এই পূণ্যভূমি বাংলাদেশে ১৯৯২ সাল নাগাদ আশ্রয় নিয়েছিলেন। আপনারা এই কথা অস্বীকার করার মতো আদম সন্তান নন যে তারও বহু আগে থেকে আরাকান থেকে এমন মানুষের আগমন এই দেশের আনাচে- কানাচে হয়নি। এই নিয়ে আমি- আপনি আম আদমি তেমন অসুবিধা মনে করিনি।

তারমধ্যে রোহিঙ্গা জাতির পুরুষেরা কায়িকশ্রমের বিনিময়ে খেয়ে পরে বেঁচে ছিল
আর নারীদের মধ্যে যারা দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে তারা দাসী হয়েছে আর দৃষ্টিনন্দন রা হয়েছে সাময়িক শয্যাসঙ্গী বা স্থায়ী অওরত।
তখন আমরা স্বাভাবিকভাবে এই অবস্থা মেনে নিয়েছি।

তথ্যমতে খুশির জন্ম ১৯৯৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশেই।
২১ টি বছর এই বাংলার আলো -বাতাসে মানুষ হয়েছে খুশি।
পাঠক কল্পনা করুন যেদিন খুশি জানতে পেরেছে এই সবুজ- শ্যামল সুন্দর দেশটি তার নয় সেদিন খুশি কি নিজেকে নিজদেশে পরবাসী মনে করেনি?
সেদিন এই বাংলা মায়ের কোল খুশির মনকে অস্তির করে তুলেনি?
* আপনারা কেনো মনে করতে পারছেন না খুশি তার নিজ জাতিকে মুক্ত করতে নিজেকে তৈরি করার সংকল্প করছে।

* যদি এই কল্পনা বাদ ও দেন তাহলে খুশি হয়তো চেয়েছে নিজেকে সচেতন করতে

* চেয়েছে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে।

আমাদের পয়গম্বর কি শিক্ষার জন্য চীন দেশে হিযরত করতে বলেন নি?

হ্যাঁ এক্ষণে আপনারা মনে মনে যুক্তি খাড়া করেছেন যে
খুশি কেনো তথ্য গোপন করে বেআইনিভাবে সুবিধা নিয়েছে?
তাহলে আমাকে এইখানে আওড়াতে হয় আল্লামা শেখ সাদী রহমতুল্লাহ (আ) এর বিখ্যাত উক্তি।

*** “যে মিথ্যায় মঙ্গল নিহিত তা অসৎ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত সত্য অপেক্ষা শ্রেষ্টতর ”

সমঝদার পাঠক উক্তিটি বুঝে আপনার খাড়া করা যুক্তি নোয়াবেন আশা করি।

***খুশি তার ২১ বছর উমরে বাংলাদেশে কোনো অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়েছে এমন রটনা রটানোর রসদ আপনাদের কাছে নেই তা কবুল করুন নিজ গুনে।

***সে এখানকার জনগোষ্ঠীর মতোই সামাজিক গুণাবলি নিয়ে নিজেকে প্রমাণ করেছে এতে আমরা হিংসার অনলে পুড়ে নিজেরাই ছাই হয়ে যাচ্ছি।

বকধার্মিক এবং হিংসুটেরা নিচের হাদিসটির অবমাননা করছেন না তো।

“হিংসা হচ্ছে আগুনের মতো
যা নিজের নেক আমলকে পুড়ে ছারখার করে ফেলে।”

একটি জাতিগোষ্ঠীর সব মানুষ শয়তান সদৃশ হয়না আবার ফেরেশতা তুল্য ও না। মানুষ ঠিক মানুষের মতোই। দোষে গুণে মানুষ। তাবৎ দেশের কথা বাদ দিয়ে আমরা আমাদের এই জেলার কথা চিন্তা করি এমন দিন কি বাকি আছে যেদিন লোমহর্ষক সব অপরাধ এখানে ঘটছেনা? তার মানে আপনি – আমি বলতে পারিনা কক্সবাজার এর সব মানুষ খারাপ বা অপরাধী। বাংলাদেশে অাশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জাতির ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ১০ শত বাদ দিন ৫ শত মানুষ নানা রকম অপরাধে অপরাধী হতে পারে, খারাপ হতে পারে। তাই বলে আমি- আপনি তাদের নিঃশ্বাসকে ঝড়ো হাওয়া হিসেবে নিতে পারিনা। একটি অসহায় জাতিকে নিজের দেশে জায়গা দিয়ে নিজেদের উদারতার পরিচয় দিয়েছেন।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের আগমনের সময় সরকারি সিদ্ধান্তের তর সয়নি আপনাদের। সরকারকে গালি দিয়েছেন, মুসলিম উদ্বাস্তুুদের জায়গা দিতে দেরী হওয়াতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
তারপর আপনারা সর্বোচ্চ সহায়তা করেছেন। নিজের অর্থ দিয়ে, বস্ত্র দিয়ে, স্থান দিয়ে এমনকি ঘরের খাদ্য দিয়ে। অনেক করেছেন রোহিঙ্গাদের জন্য। সেই আপনারাই একটা সময় এসে ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ না করে গড়পড়তা মন্তব্য করে
একটি ভাগ্যতাড়িত জাতিকে নিয়ে কুকথা বলতে শুরু করেছেন। একটি জাতির প্রতি ঘৃণা ছড়াচ্ছেন, বিদ্বেষ করছেন। এমতাবস্থায় দুটি জাতিকে মল্লযুদ্ধে ঠেলে দেওয়া পেনাল কোড়ের ১৫৩ এর (ক) ধারায় বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তিবর্গ অপরাধী বলে গণ্য হবে।

আমরা শত শত বছর ধরে এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়েছি। বর্ণবাদের শিকার হয়েছি ব্রিটিশদের কাছে, শিকার হয়েছি পাকিস্তানের কাছে। “বাঙালিরা স্বভাবতই কালো ও কুৎসিত, চুতিয়া বাঙালি ” এসব অভিধা ভুলে যাওয়ার মতো নয়।
প্রিয় পাঠক, আমাদের পাশের দেশ বর্তমানে নগ্নভাবে বর্ণবাদের প্রচার ও প্রসার করে যাচ্ছে যা আপনারা শাদা চোখে দেখতে পাচ্ছেন। মিয়ানমার কেবল জাতিগত নিধন করতেই রোহিঙ্গাদের নিয়ে কুকুর বিড়াল খেলছে। আমার দুঃখ হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমরা/ আপনারাও খেয়ালে -বেখেয়ালে ঘৃণা ছড়াচ্ছি।
আপনারা গণহারে রোহিঙ্গা নিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো এবং তাদের প্রত্যাবসান নিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার আগে বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ এর খ এবং গ পড়ে নিতে পারেন।

(খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনে অধিকার সমর্থন করিবেন এবং

(গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশকতাবাদ ও বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জণগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।

এটা আমাদের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি। কাজেই বেখেয়ালে এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে আরও বেড়ে যেতে পারে।
আপনারা রোহিঙ্গা জাতিকে গড়পড়তা বিচার করার আগে খেয়াল করতে পারেন
অশিক্ষিত, অসভ্য, ভাগ্যতাড়িত রোহিঙ্গা জাতির বেশির ভাগ মানুষ খারাপ হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারন তারা সভ্য হওয়ার সুযোগ হতে বঞ্চিত হয়েছে, শিক্ষার আলো তাদের ভেতরে পৌছতে দেয়নি মিয়ানমার
যেমন করে দিচ্ছিনা রাহি খুশিকে বিব্রত করে আমরা তার শিক্ষার বিরুদ্ধে কথা বলছি।
অনেকে প্রশ্ন তুলেছে রোহিঙ্গা খুশি চাকরি পেয়েছে আর স্থানীয়রা বঞ্চিত। খোঁজ নিয়ে দেখুন রোহিঙ্গা কোটায় খুশি চাকরি নেয়নি ( যদিও ওরকম কোনো কোটা নেই) নিজের যোগ্যতা বলেই সে চাকরি নিয়েছে।

পাঠক ধৈর্য না হারানোর জন্য পুনরায় অনুরোধ করছি।
মনে করুন খুশির বাবা- মা এদেশে আসেনি, বর্মা মুলুকেই রয়ে গেলেন। তাহলে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা তরুণী খুশির অবস্থা কি হতে পারতো?

‌‌* সে হতে পারতো বার্মিজ আর্মি দ্বারা গণধর্ষিতা

* হতে পারতো ধর্ষণের পর ক্ষতবিক্ষত লাশ

* হতে পারতো রক্তাক্ত নগ্ন দেহে জানাযা বিহীন মাটিচাপা ।

* হতে পারতো বর্তমান রোহিঙ্গা টালে ৪-৫ বাচ্চার কিশোরী মা

হ্যাঁ এসবই হয়েছে রোহিঙ্গা নারীর সাথে।

ভাইসব আপনাদের মানবতার দেশে জন্ম নিয়ে রোহিঙ্গা ঔরসজাত খুশি আজ আমাদের নারী সমাজের উজ্জল দৃষ্টান্ত।
রোহিঙ্গা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে কন্ঠ দিচ্ছে, আজ রহিমা আকতার, আমাদের খুশি আর আপনাদের অখুশি।
যদি আপনারা অতি জাতীয়তাবাদে উন্মত্ত হয়ে বলেন
কোনো দেশের মানুষ অবৈধ ভাবে অারেক দেশে অবস্থান করতে পারবেনা। তাহলে কেনো মালেশিয়ায় বোটযোগে গমন করে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আপনাদের জাত ভাইদের কঙ্কাল পড়ে থাকবে? কেনো সৌদি আরবে অবৈধভাবে লুকিয়ে – পালিয়ে কামাই করবে?
সুবোধ পাঠক কখনও বলেছিলেন এই অবৈধ অবস্থানের কথা?
শুনুন মহোদয়, একজন অনাহারী ও সহজে নিজের নাড়ির টান উপেক্ষা করে ভিনদেশী হতে চায়না। জীবন ও জীবিকার তাগিদে মনের বিরুদ্ধে জেহাদ করে দেশান্তরী হয় সকলে।
আমাদের পয়গম্বর দেশান্তরী হয়েছিলেন শখের বসে নয়, আয়েশী জীবনের জন্য ও নয় কেবল নিজ জীবন ও ধর্মের খাতিরে।
আপনারা সমাজতন্ত্রীরা, মহামতি কার্ল মার্কস এর অতিভক্তরা জানেন নিশ্চয় মার্কস এর শেষ ঠাঁই হয়েছিল লন্ডনে। মৃত্যুর সময়ও মার্কসের কোনো দেশ ছিলনা।
খোঁজ নিয়ে দেখতে পারি বাংলাদেশের নানা রাজনৈতিক দলের কর্মী তথ্য গোপন করে, নানা মিথ্যে বাহানা দিয়ে বিদেশে নাগরিকত্ব ভাগিয়ে নিয়েছে বা নিচ্ছে। আমরা কখনও বলেছি বাংলাদেশের এত সংখ্যাক মানুষ মিথ্যে তথ্য দিয়ে বিদেশে অবৈধভাবে অবস্থান করছে। বলেছি কখনও?
তাহলে আজ খুশি কোন যুক্তিতে আপনাদের অখুশির কারন হলো। আমরা ভালোবেসে খোদার সৃষ্টির প্রতি খুশি হই আর আপনারা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে উন্মত্ত হয়ে ঘৃণার চাষ করেন।

আইনস্টাইনের বরাত দিয়ে বলতে হয়
“দুটি জিনিস অসীম মহাবিশ্ব এবং মানুষের অজ্ঞতা। ”

মানুষ হিসেবে আমার অজ্ঞতা থাকতেই পারে এবং আপনি মানুষ হলে আপনারও থাকতে পারে।
উপরের কথাগুলো একান্তই আমার মতামত। আপনার মত এমনটা নাও হতে পারে তাই বলে আপনি আমাকে আপনার বিরুদ্ধচারনকারী ভাবতে পারেন না, আমাকে ঘৃণা করতে পারেন না।

সুহৃদ,
মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে
পরচর্চা, পরনিন্দা, পরহিংসা অনেক হয়েছে
এবার আমরা খানিকটা ভালোবাসার চাষ করি।
আনবিক বোমার চেয়ে শক্তিশালী ঘৃণাকে
প্রেম দিয়ে পরাস্ত করি।

লেখক
দিনুর আলম
শিক্ষার্থী রাষ্ট্রবিজ্ঞান (মাস্টার্স)
কক্সবাজার সরকারি কলেজ

Share: