তারিখ: শুক্রবার, ২৯শে মে, ২০২০ ইং, ১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Share:

বলরাম দাশ অনুপম::

সমুুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিল কুতুবদিয়ার পারভীনের স্বামী। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু তার স্বামীকে আর ফিরে আসতে দেয়নি। উল্টো ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে তার কুঁড়ে ঘরটিও। একই উপজেলার আনোয়ারা বেগমের পরিণতিও একই। সেই ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর পূর্ভাবাসের সময় লবণ চাষী স্বামী, শ্বাশুরি আর তিন মেয়ে, এক ছেলেকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছিল আনোয়ারা। কিছুদিন পর ভিঁটেতে ফিরে দেখে কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই। রোয়ানু থাবা দিয়ে তাদের ঘরটিও সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছে।

খাল ও নদীতে স্বামী মাছ ধরে যা আয়-রোজগার করতো, তা দিয়েই চলতো ব্রাহ্মনবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার তুলনা রানীর সংসার। তাদের ছোট্ট সংসারে ছিল ১ মেয়ে ও ১ ছেলে। কিন্তু ২০১৩ সালের এক ঘূর্ণিঝড় তছনছ করে দেয় তাদের সবকিছু। লন্ডভন্ড হয়ে যায় তাদের কাঁচা ঘরটি। ঘরে থাকা হাঁস-মুরগীগুলোও রক্ষা পায়নি এই ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে।

কিন্তু এই তিন নারীর সংসারের গল্প কিন্তু শুধুই হেরে যাওয়ার নয়। ঘুরে দাড়ায় তারা। পারভীন সোলতানার গুড়িয়ে যাওয়া ঘর মজবুত করে বাঁধা হয়েছে। ভিঁটেতে নতুন ঘর উঠেছে আনোয়ারা বেগমেরও। চাল উড়ে গিয়ে লন্ডভন্ড যাওয়া তুলনা রানীর ঘরটিও এখন মজবুত। শুধু তাই নয়, তাদের কারও স্বামী কিনেছে রিকশা, কেউ বা লালনপালন করছেন হাঁসমুরগী। সন্তানরাও তাদের স্কুলে যায়।

পারভীন, আনোয়ারা কিংবা তুলনা রানীর ঘুরে দাড়ানোর সারথী জেসমিন প্রেমা। যিনি তাদের আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি শিখিয়েছেন স্বাবলম্বী হওয়ার মন্ত্রও। দিয়েছেন প্রশিক্ষণ। প্রতিনিয়ত পরিচর্যা করেছে তাদের কর্মকান্ডের।
শুধু এই তিন নারীই নয়; এমন অসংখ্য বিপদগ্রস্থ নারী কিংবা পুরুষের ঘুরে দাড়ানোর জীবন-গল্পের নেপথ্যে এই জেসমিন প্রেমা। অসহায় নারী অথবা সুবিধা বঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোই যার নেশা। জীবন সংসারে হোচট খাওয়া মানুষের খুঁটি স্বরুপ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, সমাজ কল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থা (স্কাস)। যার মাধ্যমে তিনি এ পর্যন্ত আট লক্ষ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন কার্যকরভাবে।

শুরুটা হল যেভাবে::

১৯৯৫ সালে আত্মপ্রকাশ করা সংস্থা স্কাস সমাজ সেবা অধিদপ্তরের অনুমোদন পায় ১৯৯৫ সালে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, নিরক্ষর মুক্ত, অস্বাস্থ্য-অপুষ্টিমুক্ত, ক্ষুধা ও বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একের এক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে থাকে তারা। এরপর ২০০৫ সালে মিলে তাদের এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধন। ঢাকা শহর ও ধামরাই, শরীয়তপুর, ফেনী, কুমিল্লা, সিলেট, রাজবাড়ী, চাঁদপুর, নরসিংদী, মাদারীপুর জেলা জুড়ে তাদের কর্মপরিধি। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত মহিলা ও শিশুদের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তারা। চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, খাগড়াছড়ি ও এই জেলার রামগড়, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার সদর এবং উখিয়ায়ও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সংস্থাটি।

কি তাদের কার্যক্রম, পাশে আছে যারা আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, শিশু সুরক্ষা বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংস্থাটি। এছাড়া লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বন্ধ, জীবিকায়ন দক্ষতা, আয়বৃদ্ধিমূলক বিষয়ে প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম সংস্থাটি পরিচালনা করে।

পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি যেমন প্রাথমিক চিকিৎসা, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ, গার্মেন্টস শ্রমিক, মাদকসেবী, যৌনকর্মীদের মাঝে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ ও সচেতনতা এবং ঝুঁকিহ্রাস বিষয়েও রয়েছে তাদের কর্মসূচি। প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমন বন্যা, ভূমিধ্বস, টর্নেডোতে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে জরুরী ত্রাণ বিতরণ, আবাসন তৈরি, পূনর্বাসন সহায়তাও দিয়ে থাকে তারা।

স্কাস মূলত বেশকিছু দেশি ও বিদেশি সংস্থার আর্থিক সহযোগিতায় তাদের মূল কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করে আসছে। ইউএনডিপি, সেভ দ্য চিল্ড্রেন, একশনএইড বাংলাদেশ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে কাজ করে স্কাস। এছাড়া তারা KNH, AMURT, EDUCO, ইউনিসেফ, গ্লোভাল ফ্যান্ড, ইউএসসি কানাডা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর, সিএসএ সান, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও আর্থিক সহযোগিতা পেয়ে থাকে।

স্কাসের অর্জন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহায়তায় স্কাস ৫৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব প্রকল্পের প্রায় দুই লাখ প্রত্যক্ষ উপকারভোগী রয়েছেন। যাদের সঙ্গে জড়িত প্রায় আট লাখ অসহায় মানুষ। কার্যক্রমের স্বীকৃতি স্বরূপ জাতিসংঘের Economic and Social Council (ECOSOC) এর Spacial Consultative Status লাভ করে সংস্থাটি। এছাড়া মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৬ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পুরস্কৃত করে স্কাসকে।

এছাড়া স্কাসের কার্যক্রম ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য স্কাস চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা অর্জন করেন মানবাধিকার সোসাইটি কর্তৃক মানবাধিকার সম্মাননা-২০১১, এনজিও পার্সোনালিটি কবি জীবনানন্দ দাশ সম্মাননা-২০১২, সমাজ সেবায় বিশেষ অবদানের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সম্মাননা স্মারক-২০১২, সাপ্তাহিক সমধারার উদ্যোগে উন্নয়ন সংগঠক হিসাবে গুণীজন সম্মাননা-২০১, ভাষা স্মৃতি সন্মাননা-২০১৩, একুশে স্মৃতি ইন্দিরা গান্ধী পদক-২০১৫ এবং সর্বশেষ ২০২০ সালে মহাত্মা গান্ধী পুরস্কার। তাঁর ঝুড়িতে উঠেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের স্বীকৃতিও। এছাড়া তিনি ফেডারেশন অব এনজিও’স ইন বাংলাদেশ (এফএনবি), বাংলাদেশ মানববাধিকার সমন্বয় পরিষদ (বামাসফ), পিপল হেলথ্ মুভমেন্ট (পিএইচএম), Bangladesh Inter-Religious Council for Peace and Justice (BICPAJ) এর কার্যনির্বাহী সদস্য। জেসমিন প্রেমা বলেন, ‘গত ২৭ বছর থেকে কাজ করছি দেশের জন্য।

বাংলাদেশের মেয়ে আমি, এটাই আমার গর্ব এবং অহংকার। দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি গ্রামেগঞ্জে, বস্তিতে, রাস্তা ঘাটে। ঝড়-বৃষ্টি, জ্বলোচ্ছাস, ভূমিকম্প যাই হোক না কেন আমরা থেমে যাইনি। তিনি অারো জানান, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও মানুষকে নানা ভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।

Share: