তারিখ: মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২০ ইং, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

Share:

২০১৯ সাল ৪ নভেম্বর , প্রথম যোগদান করলাম কোন এনজিওর চাকরিতে। যে দিন যোগদান সেদিনই কাজ। এসি মাইক্রোবাসে করে গেলাম পালংখালী। ততক্ষণে ১০.৩০ টা। রোদ একটু গরম থাকলেও চাকরির ১ম দিন বলে কথা! সাথে নতুন এক কলিক শাহজাহান। কাজ ছিল ৯নং ওয়ার্ডের সীমানা চিহ্নিত করে আসা, এবং এলাকার রাস্তাঘাট একটু চিহ্নিত করা, একটু ঘুরে আসলাম। দুপুর ১.৩০টা। ততক্ষণে গাড়ি এসে হাজির, সাথে আছে আমাদের প্রিয় সুপারভাইজার সাদেক ভাই। মিষ্টি গলায় বললেন, আপনারা কি এলাকাটি একটু ঘুরে দেখেছেন? আমরা বললাম, হ্যাঁ, সুন্দর এলাকা, নাফ নদীর পাড়ে মনোরম দৃশ্য, সত্যিই দারুণ লেগেছে। ঐ দিনের মত কাজ শেষ করে চলে আসলাম। এর পরেরদিনও একই কাজ। ঠিকমত ঘুরে আসলাম। এর পরের দিন কিছু ফরম দেওয়া হল, তারপর বাড়ি বাড়ি যাওয়া শুরু, সামান্য ব্রিফিং দিয়ে সাদেক ভাই আমাদের হাতে কতগুলো ফরম তুলেদেন, ঐগুলো নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করি। কাজগুলো করা খুব কঠিন থাকলেও নতুন চাকরি হিসেবে ভালই লাগত। কাজের ৭ম দিন আমার কাজের জায়গা পরিবর্তন হল, ৯নং ওয়ার্ডের পরিবর্তে ৬নং ওয়ার্ডে কাজ করতে হবে। সাথে পেলাম নতুন তিনজন কলিক কামাল, শিউলি, খালেক। মিশন শুরু। গ্রামের কাচাঁ রাস্তা দিয়ে ৪/৫ কিলোমিটার টমটমে যাওয়ার পর পায়ে হেটে প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার পাহাড়ি এলাকায় যেতে হয়। রাখাইন সম্প্রদায়ের এলাকা। তবে ভালই লাগতেছে, গ্রামের এলাকা বলে কথা। আমরা একটু ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করি, প্রচুর রোদ, হাটতে কষ্ট হয় বলে এক জায়গায় বসে পাশের কয়েকবাড়ির লোক ডেকে এনে ফরমগুলো পুরণ করতাম। একদিন প্রচণ্ড রোদ, এক বাসার উঠানে বসে কাজ করতেছি, ঠিক ঐ সময় আমাদের সুপারভাইজার সাদেক ভাই আর শামীম ভাই হেটে হেটে আমাদের কাজ মনিটরিং করতে এলাকায় পৌঁছে যায়। আমরা অবাক হয়ে গেলাম, এত রোদ কি করে হেটে আসল ওনারা! তবে একটা কথা ডিএসকে’তে তো ফাঁকি দেওয়া যায় না। তারপর, আমরা অফিসের সিদ্ধান্ত মত কাজ করতেই থাকি। কিন্তু, পরে পরে কাজ যে এত কঠিন হবে কে জানত! আমরা সমস্থ উপকারভোগীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ শেষ করলাম। অফিস প্রদত্ত তালিকায় কিছু বড়লোক থাকায় আমরা কিছু গরীবের বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহ করে অফিসে জমা দিই। বড়লোক গুলো বাদ দিয়ে গরিবদের উপকারভোগীর তালিকায় যোগকরার সুপারিশ করি। তখন অফিস সাদেক ভাই ও শামীম ভাইকে ছাড়া নতুন আরেকজন মনিটরিং অফিসার ফয়সাল ভাইকে মনিটরিং করতে পাঠায়। ফয়সাল ভাই প্রায় আমাদের সমবয়সী হলেও ওনার মেজাজ একটু কড়া, ওনি সেই পাহাড়ে পাহাড়ে গিয়ে কয়েকটি বাড়ি পরিদর্শন করে। তারপর চূড়ান্ত বাছাই শেষ করে এখন উপকারভোগীদের উপকৃত করার পালা। তখন আরেক মস্তবড় ঝামেলা! আমরা চাইছিলাম বিকাশ বা নগদে তাদের টাকাগুলো দিয়েদিই, বা হাতে হাতে দিই। কিন্তু না! একহাজার উপকারভোগীকে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দিতে হবে! হাতে পর্যাপ্ত সময়ও নাই। আমাদের সুপারভাইজার সাদেক ভাই, শামীম ভাই, প্রজেক্ট ম্যানেজার সন্জিত হাজং দাদা, কোঅর্ডিনেটর প্রদিপ দাদা ব্যাংকের সাথে কথা বলে এ্যাকাউন্ট সময় ঠিক করে। আমাদের হাজারো বিপত্তির সত্ত্বেও আমাদের প্রজেক্ট ম্যানেজার হাতে, বিকাশে বা নগদে টাকা দিতে রাজি হননি। এমনকি আমরা কয়েকটি এনজিওর উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে চেয়েছি মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে টাকা দিই। তখন তিনি বললেন, মোবাইলে টাকা দিলে দুর্নীতি হতে পারে। তারপর ব্যাংকে এ্যাকাউন্ট করা শুরু করলাম। বুঝতেই তো পারছেন ১০০০(এক হাজার) এ্যাকাউন্ট করতে কত সময় লাগবে! সময় মাত্র তিনদিন, এমনকি ঐ তিন দিন সকাল ৭.৩০টা থেকে রাত ৮.০০টা পর্যন্ত একটানা কাজ করতে হয়েছে। আসলে তখন ফাঁকি দেওয়ার কোন চিন্তা মাথায়ও আসেনি। কারণ, সুপারভাইজার সাদেক ভাই শামীম ভাই সবসময় সাথে থাকত, ভুল হলে সাথে সাথে শুধরে দিত।

প্রজেক্ট ম্যানেজার হাজং দাদা অনেক সময় আমাদের আগে ফিল্ডে গিয়ে হাজির হত! এ্যাকাউন্ট করাতে গিয়ে কাগজপত্র ঠিক করতে আমাদের কত কষ্ট হয়েছে তা বলে বুঝানো সম্ভবনা। অনেকসময় দুপুরের খাবারের কথাও ভুলে যেতাম। তা শুধু আমি কেন, আমাদের সুপারভাইজার দুপুরে যে কত বেলা ভাত খায়নি তার কোন হিসাব নাই। কাজ তো সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে। আরেকটি কথা না বললেই নয়, আমাদের কাজের এলাকা ছিল পালংখালী। ওখানকার চেয়ারম্যান “গফুর উদ্দিন চৌধুরী”। উনি জনগণের জন্য কতটা পরিশ্রম করে তা ওনার সাথে কাজ না করলে বুঝা বড় মুশকিল।
আর হোষ্ট কমিউনিটিতে কাজ করা কত যে চ্যালেঞ্জ! আমাকে বাদ দিলেন কেন? উনাকে বাদ দিলেন কেন? অনেক সময় কত হুমকি ধামকি! কত গালিগালাজ! আরো কত কি।
তবে অনেকে আবার নিজের মত করে সাহায্য করে, বাড়ি না চিনলে সাথে করে বাড়িতে নিয়ে যায়। পথ না চিনলে পথ চিনিয়ে দেয়। তা আসলেই ভুলার মত নয়।
এ্যাকাউন্ট করা শেষ হলেই টাকা প্রদান শুরু করি। টাকাটি এভাবে দিতে হয়েছে, শুধু টাকা দিলেই হবেনা, সাথে সাাথে প্রত্যেক উপকারভোগীর টাকা সংবলিত ছবিও তুলতে হয়েছে। দুই তিনদিনে সমস্ত টাকা দিয়ে শেষ করতে হয়ছে। দুই তিনজন টাকার জন্য আসে নি, খবর জানেনা তারা। আবার তাদের বাড়িতে গিয়ে ডেকে এনে টাকা দিতে হয়েছে।
টাকা দেওয়া শেষ হলেই ক্যাম্পে হাইজিং কিট বিতরণ ও টয়লেট পরিস্কারের কাজ! ইঞ্জিনিয়ার মাসুম ভাইয়ের নেতৃত্বে কাজ চলতেছে। ওখানে কয়েকজন শুরু থেকে কাজ করলেও আমাদের কাজ শেষ করে ওখানে কাজ শুরু করতে হয়। বল্লকে বল্লকে গিয়ে তালিকা তৈরি ঘরের নাম্বার সংগ্রহ করা, ব্যাক্তির নাম্বার সংগ্রহ করা ইত্যাদি। যেমন আদেশ তেমন কাজ। শুরু হল অভিযান, ডিএসকের হেল্থ সেন্টারে সকাল ৮.০০ টায় পৌছতে হয়, সেখান থেকে নির্দেশনা মোতাবেক কাজে যেতে হয়। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দ্রুত কাজ শেষ হয়। বিশ্বাস করেন, এতটুকু ফাঁকি দেওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। এতটুকু দুর্নীতি করার কোন কোন সুযোগ ছিল না। আশ্চর্যের বিষয়, অনেকসময় প্রজেক্ট ম্যানেজার আমাদের আগেই অনেকবার ফিল্ডে গেছে।
এর মাঝে প্রচণ্ড গরমে আমার একদিন অসুখ হয়ে যায়। হোয়াট্সএপে শুধু একলাইন লিখছি যে “আমি অসুস্থ দোয়া করবেন”। বিশ্বাস করেন, এক মিনিটের পার হওয়ার আগেই প্রজেক্ট ম্যানেজার সন্জিত হাজং দাদা কলদিয়ে খোজ নিলেন, এর পরই সাদেক ভাই কল দিলেন। আমি সত্যিই আশ্চর্য হয়ে গেলাম।

ওয়ার্ল্ডভিষণের নষ্ট এফএসএম’এ আমরা ময়লা ফেলতে গিয়ে ওটা নষ্ট হয়ে যায়, কারণ ওটা নষ্ট ছিল। আমাদের ইঞ্জিনিয়ার মাসুম ভাই সরল মানুষ, ওনার সরলতা আমাদের জন্য কাল হয়ে দাড়ায়। তখন আমাদের হাজং দাদা রেগে আগুন। আমরা ওয়ার্ল্ড ভিষণের এফএসএম ঠিক করে দিই। তব। ওখানে আর কোন ময়লা ফেলি নাই।
আবার এদিকে হাইজিং কিট কেনা হয়ে গেছে। ফয়সাল ভাইয়ের নেতৃত্বে প্যাকেটিং করা শেষ। রোহিঙ্গাদের বল্লক নেতাদের সাথে নিয়ে আমরা অনেক কষ্টে হাইজিং কিট বিতরণ শেষ করি।
আসলে সমস্ত কর্মযজ্ঞ শেষ করতে হয় দুই মাসের মধ্যেই। আমরা যে কত দৌড়ের উপর ছিলাম তা বুঝাতে পারবনা। আমাদের সমস্ত টিম, প্রজেক্ট ম্যানেজার, মনিটরিং অফিসার, সুপারভাইজার, ইঞ্জিনিয়ার আমরা কমিউনিটি মবিলাইজার, কমিউনিটি ভলান্টিয়ার সবাই এত আন্তরিক ছিলাম আমাদের কাজের প্রতি, যার ফলে আমরা দুইমাসের একদিন আগে সমস্ত কর্মযজ্ঞ শেষ করেছিলাম। এমনকি আমরা যে টাকাগুলো উপকারভোগীদের দিয়েছি, তা কি কাজে ব্যবহার করেছে তার রিপোর্ট ও আমরা অফিসকে প্রদাণ করতে সক্ষম হয়েছি।
তাইতো প্রজেক্ট ক্লোজিং মিঠিংয়ে ডিএসকে’র অন্য এক প্রজেক্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার ‘মুর্তজা আলী’ ভাই বলছিলেন, আপনার সিএইডের এই টিম যে এতবড় অসাধ্য সাধন করতে পারবে তা আমার জানা ছিলনা। আপনারা আসলে খুব আন্তরিকতার সাথে কাজটি শেষ করেছেন। আপনাদের এই টিম যদি আমি পেতাম তাহলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করতাম। যদি আমার প্রজেক্টে কোনরকম সুযোগ সুবিধা থাকে তাহলে আপনাদের আমি অবশ্যয় সুযোগ দিব।”

সর্বোপরি, আসলে ডিএসকে’তে কাজ করে এতটুকু বুঝতে পারলাম, ওখাসে কোন রকম দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতি কাজ করেনা। সঠিক কাজটি যে কোন মূল্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হয়। আর সিনিয়র যারা আছেন, ওনারা আসলে অনেক বেশি আন্তরিক। মাস শেষ হওয়ার আগেই কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করে দিতেন।

ধন্যবাদ ডিএসকে পরিবার।

লেখক;
আনোয়ারউল ইসলাম সিকদার
কমিউনিটি মবিলাইজার(৪/১১/১৯ইং-৩১/১১/২০১৯ইং)
ডিএসকে(সিএইড)
Email: anwarsikder05@gmail.com

Share: